সাম্প্রতিক বিষয় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাম্প্রতিক বিষয় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
এর দ্বারা পোস্ট করা
suMon azaD (সুমন আজাদ)
শিরোনামটা পড়ার সাথে সাথে যে বিষয়টা মাথায় আসবে তা হল এ কোন দেশে বাস করছি আমরা? প্রচলিত আইন মেনে প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ে কোর্টম্যারেজ করেছে। তারপর তাদের পরিবার সেই বিষয়টা মেনে নিয়েছে যার কারণে তারা ঘরে ফিরে গেছে। সেখানে চেয়ারম্যান কে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার? পত্রিকায় নিউজটা পড়ার পর আমি হতবাক হয়ে গেছি! পত্রিকার উপর বিশ্বাস না করে আমি সেই এলাকায় ব্যক্তিগত ভাবে খুজ নিয়ে সত্যতা যাচাই করেছি। সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে যা জানলাম তা আরো ভয়াবহ! এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, চেয়ারম্যান বিচারের নামে ছেলের উপর নির্যাতন করেছে এবং মেয়েকেও সবার সামনে উলঙ্গ করেছে। কি আশ্চর্য্য! চেয়ারম্যান কেনো এমন করবে? তার সমস্যা কি? তার নির্বাচিত এলাকায় কি প্রেম করে বিয়ে করা নিষেধ নাকি? সেখানে কি তার রাজত্ব চলে? তার আইন সবাইকে মানতে হয়? বাংলাদেশের প্রচলিত আইন মেনে চললে নজরুল চেয়ারম্যানের কি নিজস্ব আইন ভঙ্গ হয়?
এখান থেকে নিউজটা পড়তে পারেন
নিউজটা পড়ে এবং খোজ নিয়ে যা জানলাম তার প্রেক্ষিতে নজরুল চেয়ারম্যানকে নিয়ে আমার যে ধারণা হচ্ছে তা হল:
এক. চেয়ারম্যান মানুষিক সমস্যাগ্রস্থ।
দুই. আতংকের মাধ্যমে নিজের আধিপত্ত বিস্তার।
তিন. মেয়েটির প্রতি তার আকর্ষণ।
চার. মৌলবাদীদের দালাল: ফতোয়া চালু করার চেষ্ঠা
নজরুল চেয়ারম্যান যদি মানুষিক সমস্যাগ্রস্থ না হত তাহলে সে এমন শাস্তি কেনো দেবে? স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় চেয়ারম্যানের হাতে এলাকার সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা দেয়া হয়। কিন্তু তার বিচারের এবং শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তাকে কে দিলো? বাংলাদেশের কোন বিচার ব্যবস্থায় আছে পালিয়ে আইনগত ভাবে বিয়ে করলে তার জননাঙ্গে ইট ঝুলিয়ে দিতে হবে? মৌলবাদীদের ফতোয়া প্রথার চেয়েও ভয়াবহ প্রথা চালু করতে চাওয়া মানুষিক বিকৃতির লক্ষণ ছাড়া কি হতে পারে? আর যে মানুষের মস্তিস্ক কাজ করে না, তার বিচার বিবেচনা লোপ পেয়েছে বলে মনে হয় সে কিভাবে একটা এলাকার কার্যভার নির্বাহ করবে?
নজরুল চেয়ারম্যানের কর্মকান্ড দেখে মনে হচ্ছে সে তার নির্বাচিত এলাকায় আতংক সৃষ্ঠি করতে চায়। তার বিচারিক আতংকের মাধ্যমে নিজেকে এলাকার নতুন গডফাদার হিসেবে স্থাপন করতে চায়। যার জন্য সে বেচে নিয়েছে আপাতত গরীব ঘরের ছেলেমেয়েকে। যাদের উপর নির্যাতন করলেও তারা প্রতিবাদ করার সাহস পাবে না আর অন্যকেউ প্রতিবাদও করবে না। নজরুল হয়তো ভেবেছে আপাতদৃষ্টিতে ছোট একটি সংবাদ যা স্থানীয় পত্রিকায়ও আসবে না। সমাজের সচেতন মানুষ জানবে না। কোনো বড় পত্রিকায় এ নিয়ে কিছু লিখা হবে না। সে তার নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা চালু করতে পারবে নিজের এলাকায় সদম্ভে। হয়তো নজরুলের আরো অনেক অমানুষিক বিচার ও কর্মকান্ড আমরা জানি না পত্রিকায় আসেনি বলে। তাই সে নিজেকে ধীরে ধীরে গডফাদার ভাবতে শুরু করেছে।
আমি তার সম্পর্কে জানতে গিয়ে জেনেছি সন্তান হয় না এই অপরাধে সে নাকি তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর। কাপড় খুলে ছেলেমেয়েকে শাস্তি দেওয়ার পিছনে কি চেয়ারম্যানের যৌন অভিপ্সা চরিত্রার্ত করার কোনো কারণ ছিল? চেয়ারম্যান ছেলের জননাঙ্গে ইট ঝুলিয়ে কি প্রমাণ করতে চেয়েছে? সে কি মেয়েটিকে শরীরিক বা মানুষিক ভাবে চেয়েছিল? তাই সে ছেলেটিকে এই শাস্তি দিলো? পত্রিকায় আসেনি কিন্তু জেনেছি মেয়েটিকে উলঙ্গ করা হয়েছিল। কিন্তু কেনো? চেয়ারম্যানের কোন উদ্দেশ্য চরিত্রার্ত করার জন্য মেয়েটিকে বিবস্থ করা হলো? কি উদ্দেশ্যে এই বিচার করেন চেয়ারম্যান?
বাংলাদেশ থেকে যখন কুসংস্কার, ফতোয়াপ্রথা, অন্ধবিশ্বাস বিদায় নিচ্ছে তখন কে এই নজরুল চেয়ারম্যান যে কিনা আদিম বিচার ব্যবস্থা চালু করতে চায় তাও আবার বিনা অপরাধে? সে কোন মৌলবাদীদের দালাল হয়ে কাজ করছে বিচারের নামে অমানুষিক এবং মানবাধীকার লঙ্গনের মত বিচার করে? নজরুলদের হাত কতটা উপড়ে থাকলে সে মিডিয়াকে মানা করতে পারে নিউজ না ছাপানোর জন্য? একবার নিবার্চিত চেয়ারম্যান হয়ে সেকি ভেবে নিয়েছে তাকে আর কেউ কিছু করতে পারবে না? প্রচলিত আইন মেনে যারা বিয়ে করেছে তাদেরকে সে তার আইন মত শাস্তি দিয়ে কি বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের বিরোধী সে করেনি? একজন চেয়ারম্যান যদি বাংলাদেশের আইন না মেনে নিজের আইনের প্রচলন করতে চায় তাহলে কি আদালত অবমাননা করলো না? যেখানে ছেলে আর মেনে বৈধভাবে আইন মেনে বিবাহ করেছে?
নজরুলের মত সদ্য গজিয়ে উঠা আগাছাদের এখনই থামাতে হবে। তারা সমাজের উচু আসনে থেকে সমাজের অন্ধকার বিকাশে ভূমিকা রাখে। আজ একটি খবর প্রকাশিত হওয়ায় আমরা নজরুলদের বিচার, নজরুলদের কর্ম জানতে পারলাম। কিন্তু এমন অনেক খবর অন্তরালে থেকে যায়। আর এই সুযোগে নজরুলরা আগাছা থেকে বিষবৃক্ষে পরিনত হয়।
এখান থেকে নিউজটা পড়তে পারেন
নিউজটা পড়ে এবং খোজ নিয়ে যা জানলাম তার প্রেক্ষিতে নজরুল চেয়ারম্যানকে নিয়ে আমার যে ধারণা হচ্ছে তা হল:
এক. চেয়ারম্যান মানুষিক সমস্যাগ্রস্থ।
দুই. আতংকের মাধ্যমে নিজের আধিপত্ত বিস্তার।
তিন. মেয়েটির প্রতি তার আকর্ষণ।
চার. মৌলবাদীদের দালাল: ফতোয়া চালু করার চেষ্ঠা
নজরুল চেয়ারম্যান যদি মানুষিক সমস্যাগ্রস্থ না হত তাহলে সে এমন শাস্তি কেনো দেবে? স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় চেয়ারম্যানের হাতে এলাকার সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা দেয়া হয়। কিন্তু তার বিচারের এবং শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তাকে কে দিলো? বাংলাদেশের কোন বিচার ব্যবস্থায় আছে পালিয়ে আইনগত ভাবে বিয়ে করলে তার জননাঙ্গে ইট ঝুলিয়ে দিতে হবে? মৌলবাদীদের ফতোয়া প্রথার চেয়েও ভয়াবহ প্রথা চালু করতে চাওয়া মানুষিক বিকৃতির লক্ষণ ছাড়া কি হতে পারে? আর যে মানুষের মস্তিস্ক কাজ করে না, তার বিচার বিবেচনা লোপ পেয়েছে বলে মনে হয় সে কিভাবে একটা এলাকার কার্যভার নির্বাহ করবে?
নজরুল চেয়ারম্যানের কর্মকান্ড দেখে মনে হচ্ছে সে তার নির্বাচিত এলাকায় আতংক সৃষ্ঠি করতে চায়। তার বিচারিক আতংকের মাধ্যমে নিজেকে এলাকার নতুন গডফাদার হিসেবে স্থাপন করতে চায়। যার জন্য সে বেচে নিয়েছে আপাতত গরীব ঘরের ছেলেমেয়েকে। যাদের উপর নির্যাতন করলেও তারা প্রতিবাদ করার সাহস পাবে না আর অন্যকেউ প্রতিবাদও করবে না। নজরুল হয়তো ভেবেছে আপাতদৃষ্টিতে ছোট একটি সংবাদ যা স্থানীয় পত্রিকায়ও আসবে না। সমাজের সচেতন মানুষ জানবে না। কোনো বড় পত্রিকায় এ নিয়ে কিছু লিখা হবে না। সে তার নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা চালু করতে পারবে নিজের এলাকায় সদম্ভে। হয়তো নজরুলের আরো অনেক অমানুষিক বিচার ও কর্মকান্ড আমরা জানি না পত্রিকায় আসেনি বলে। তাই সে নিজেকে ধীরে ধীরে গডফাদার ভাবতে শুরু করেছে।
আমি তার সম্পর্কে জানতে গিয়ে জেনেছি সন্তান হয় না এই অপরাধে সে নাকি তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর। কাপড় খুলে ছেলেমেয়েকে শাস্তি দেওয়ার পিছনে কি চেয়ারম্যানের যৌন অভিপ্সা চরিত্রার্ত করার কোনো কারণ ছিল? চেয়ারম্যান ছেলের জননাঙ্গে ইট ঝুলিয়ে কি প্রমাণ করতে চেয়েছে? সে কি মেয়েটিকে শরীরিক বা মানুষিক ভাবে চেয়েছিল? তাই সে ছেলেটিকে এই শাস্তি দিলো? পত্রিকায় আসেনি কিন্তু জেনেছি মেয়েটিকে উলঙ্গ করা হয়েছিল। কিন্তু কেনো? চেয়ারম্যানের কোন উদ্দেশ্য চরিত্রার্ত করার জন্য মেয়েটিকে বিবস্থ করা হলো? কি উদ্দেশ্যে এই বিচার করেন চেয়ারম্যান?
বাংলাদেশ থেকে যখন কুসংস্কার, ফতোয়াপ্রথা, অন্ধবিশ্বাস বিদায় নিচ্ছে তখন কে এই নজরুল চেয়ারম্যান যে কিনা আদিম বিচার ব্যবস্থা চালু করতে চায় তাও আবার বিনা অপরাধে? সে কোন মৌলবাদীদের দালাল হয়ে কাজ করছে বিচারের নামে অমানুষিক এবং মানবাধীকার লঙ্গনের মত বিচার করে? নজরুলদের হাত কতটা উপড়ে থাকলে সে মিডিয়াকে মানা করতে পারে নিউজ না ছাপানোর জন্য? একবার নিবার্চিত চেয়ারম্যান হয়ে সেকি ভেবে নিয়েছে তাকে আর কেউ কিছু করতে পারবে না? প্রচলিত আইন মেনে যারা বিয়ে করেছে তাদেরকে সে তার আইন মত শাস্তি দিয়ে কি বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের বিরোধী সে করেনি? একজন চেয়ারম্যান যদি বাংলাদেশের আইন না মেনে নিজের আইনের প্রচলন করতে চায় তাহলে কি আদালত অবমাননা করলো না? যেখানে ছেলে আর মেনে বৈধভাবে আইন মেনে বিবাহ করেছে?
নজরুলের মত সদ্য গজিয়ে উঠা আগাছাদের এখনই থামাতে হবে। তারা সমাজের উচু আসনে থেকে সমাজের অন্ধকার বিকাশে ভূমিকা রাখে। আজ একটি খবর প্রকাশিত হওয়ায় আমরা নজরুলদের বিচার, নজরুলদের কর্ম জানতে পারলাম। কিন্তু এমন অনেক খবর অন্তরালে থেকে যায়। আর এই সুযোগে নজরুলরা আগাছা থেকে বিষবৃক্ষে পরিনত হয়।
লেবেলসমূহ:
সাম্প্রতিক বিষয়
এর দ্বারা পোস্ট করা
suMon azaD (সুমন আজাদ)
সৌদি আরবে কোরান এর বিধানের অপপ্রয়োগে!!!
আট বাংলাদেশীর শীরচ্ছেদ
একই অপরাধে ব্রিটিশ, কানাডা, আমেরিকা, ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহ’র আইন মানা হয় না
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অপপ্রয়োগ কেনো?
::
কিছুদিন আগে সৌদি আরবে ৮ বাংলাদেশীর শিরচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু তা কি শরীয়ত সম্মত ছিল? তাদের কি অপরাধ ছিল? ৮ জন মিলে একজন কে হত্যা এবং ডাকাতি? যাই হোক কুরআন শরীফে খুনীর শাস্তির ফয়সালা হলো কতল। কিন্তু ৪ জন চাক্ষুষ সাক্ষী অবশ্যই লাগবে। যদি চার জন সাক্ষী না পাওয়া যায় তাহলে ওই অপরাধীকে শাস্তি দেয়া যাবেনা। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ বা মামলার বাদী এ বিষয়ে চারজন সাক্ষী পেশ করতে পারে নি। আসামীদের স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছে। কিন্তু আসামীরা কি স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছায় দিয়েছে তার কোন প্রমান নেই। তাদেরকে বল প্রয়োগ করে ও স্বীকারোক্তি আদায় করা হতে পারে যা ইসলামে গ্রহনযোগ্য নয়।
উল্লেখ্য এই সৌদি ওহাবী সরকার তারা অপরাধীদের বিষয়ে হিন্দু রাষ্ট্র ভারতের সাথে চুক্তি করেছে যে অপরাধীদেরকে সৌদি আরব থেকে পাঠিয়ে দেয়া হবে এবং শাস্তি প্রদান করবে ভারত। কিন্তু একই বিষয়ে দুই নীতি কেন? তাও মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সহানুভূতি পাওয়ার কথা ছিলো বেশী। তা না করে এই ইয়েমেনী দস্যু এবং ইহুদী বংশধর ওহাবী সৌদি সরকার বাংলাদেশের প্রতি বৈষম্য করেছে। ইসলামী বিধানের দোহাই দিয়ে ৮ জনকে কতল করেছে। কিন্তু তারা প্রকৃত পক্ষে ইসলামী বিধানের ভুল এবং অপপ্রয়োগ করেছে। এরা অআসলে ইসলাম-মুসলিম কারো বন্ধু নয়। এরা মুসলমান নামধারী মুনাফিক যারাকিনা ইহুদী, কাফির-মুশরিকদের দালালী করে মুসলমানদের ক্ষতি করতে চায়। এরা ইসলাম ইসলাম করলে ও হারাম রাজতন্ত্র চালায়। এ মুসলিম নামধারী মুনাফিকদের ব্যাপারে সাবধান!!!!!!!!!!!!
নভেম্বর ১৭ ও ২৩, ২০০০:
রিয়াদে ২ টি বম্ব ব্লাস্ট এ বেশ কিছু মানুষ হতাহত হয়।
ফেব্রুয়ারী ৪, ২০০১:
কানাডিয়ান উইলিয়াম সিম্পসন ও ব্রিটিশ আলেকজান্ডার মাইকেল ও আরও কয়েকজন প্রকাশ্যে টিভিতে স্বিকার করে যে তারা সেই সব বম্ব ব্লাস্ট ঘাটয়েছে।
এপ্রিল ২০০২:
জানা যায় যে ২০০১ সালে তাদের মৃত্যু দন্ড ঘোষনা করা হয়েছে।
নভেম্বার ২০০২:
উইলিয়াম সিম্পসন এর বাবা আশা প্রকাশ করেন তার ছেলে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। প্যারিসে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে সৌদী পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রিন্স সৌদ আল-ফয়সাল বলেন, কানাডার মত বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের এক নাগরিকের মুক্তির জন্য তার রাষ্ট্র যথাসাধ্য চেষ্টা করছে ও করে যাবে।
মে, ২০০৩:
উইলিয়াম সিম্পসন এর সৌদী ল'ইয়ার শেখ সালাহ্ সি.বি.সি নিউজ কে জানান তারা সৌদী রাজ পরিবারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং সংকেত পেয়েছেন যে তাদের এ আবেদন গৃহিত হবে এবং উইলিয়াম সিম্পসন খুব শিঘ্রই মুক্তি পাবে।
আগস্ট ২০০৩:
সৌদী বাদশাহ'র ক্ষমার প্রেক্ষিতে উইলিয়াম সিম্পসন সহ আরও ৫ ব্রিটিশ নাগরিক মুক্তি পায়।
ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করা হয় ব্রিটিশ যুবরাজ চার্লস্ উইলিয়াম সিম্পসন সহ আরও ৫ ব্রিটিশ নাগরিক মুক্তির ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
ঈষদ সংক্ষিপ্ত। সূত্র : http://www.cbc.ca/news/background/sampson/
আট বাংলাদেশীর শীরচ্ছেদ
একই অপরাধে ব্রিটিশ, কানাডা, আমেরিকা, ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহ’র আইন মানা হয় না
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অপপ্রয়োগ কেনো?
::
কিছুদিন আগে সৌদি আরবে ৮ বাংলাদেশীর শিরচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু তা কি শরীয়ত সম্মত ছিল? তাদের কি অপরাধ ছিল? ৮ জন মিলে একজন কে হত্যা এবং ডাকাতি? যাই হোক কুরআন শরীফে খুনীর শাস্তির ফয়সালা হলো কতল। কিন্তু ৪ জন চাক্ষুষ সাক্ষী অবশ্যই লাগবে। যদি চার জন সাক্ষী না পাওয়া যায় তাহলে ওই অপরাধীকে শাস্তি দেয়া যাবেনা। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ বা মামলার বাদী এ বিষয়ে চারজন সাক্ষী পেশ করতে পারে নি। আসামীদের স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছে। কিন্তু আসামীরা কি স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছায় দিয়েছে তার কোন প্রমান নেই। তাদেরকে বল প্রয়োগ করে ও স্বীকারোক্তি আদায় করা হতে পারে যা ইসলামে গ্রহনযোগ্য নয়।
উল্লেখ্য এই সৌদি ওহাবী সরকার তারা অপরাধীদের বিষয়ে হিন্দু রাষ্ট্র ভারতের সাথে চুক্তি করেছে যে অপরাধীদেরকে সৌদি আরব থেকে পাঠিয়ে দেয়া হবে এবং শাস্তি প্রদান করবে ভারত। কিন্তু একই বিষয়ে দুই নীতি কেন? তাও মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সহানুভূতি পাওয়ার কথা ছিলো বেশী। তা না করে এই ইয়েমেনী দস্যু এবং ইহুদী বংশধর ওহাবী সৌদি সরকার বাংলাদেশের প্রতি বৈষম্য করেছে। ইসলামী বিধানের দোহাই দিয়ে ৮ জনকে কতল করেছে। কিন্তু তারা প্রকৃত পক্ষে ইসলামী বিধানের ভুল এবং অপপ্রয়োগ করেছে। এরা অআসলে ইসলাম-মুসলিম কারো বন্ধু নয়। এরা মুসলমান নামধারী মুনাফিক যারাকিনা ইহুদী, কাফির-মুশরিকদের দালালী করে মুসলমানদের ক্ষতি করতে চায়। এরা ইসলাম ইসলাম করলে ও হারাম রাজতন্ত্র চালায়। এ মুসলিম নামধারী মুনাফিকদের ব্যাপারে সাবধান!!!!!!!!!!!!
নভেম্বর ১৭ ও ২৩, ২০০০:
রিয়াদে ২ টি বম্ব ব্লাস্ট এ বেশ কিছু মানুষ হতাহত হয়।
ফেব্রুয়ারী ৪, ২০০১:
কানাডিয়ান উইলিয়াম সিম্পসন ও ব্রিটিশ আলেকজান্ডার মাইকেল ও আরও কয়েকজন প্রকাশ্যে টিভিতে স্বিকার করে যে তারা সেই সব বম্ব ব্লাস্ট ঘাটয়েছে।
এপ্রিল ২০০২:
জানা যায় যে ২০০১ সালে তাদের মৃত্যু দন্ড ঘোষনা করা হয়েছে।
নভেম্বার ২০০২:
উইলিয়াম সিম্পসন এর বাবা আশা প্রকাশ করেন তার ছেলে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। প্যারিসে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে সৌদী পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রিন্স সৌদ আল-ফয়সাল বলেন, কানাডার মত বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের এক নাগরিকের মুক্তির জন্য তার রাষ্ট্র যথাসাধ্য চেষ্টা করছে ও করে যাবে।
মে, ২০০৩:
উইলিয়াম সিম্পসন এর সৌদী ল'ইয়ার শেখ সালাহ্ সি.বি.সি নিউজ কে জানান তারা সৌদী রাজ পরিবারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং সংকেত পেয়েছেন যে তাদের এ আবেদন গৃহিত হবে এবং উইলিয়াম সিম্পসন খুব শিঘ্রই মুক্তি পাবে।
আগস্ট ২০০৩:
সৌদী বাদশাহ'র ক্ষমার প্রেক্ষিতে উইলিয়াম সিম্পসন সহ আরও ৫ ব্রিটিশ নাগরিক মুক্তি পায়।
ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করা হয় ব্রিটিশ যুবরাজ চার্লস্ উইলিয়াম সিম্পসন সহ আরও ৫ ব্রিটিশ নাগরিক মুক্তির ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
ঈষদ সংক্ষিপ্ত। সূত্র : http://www.cbc.ca/news/background/sampson/
লেবেলসমূহ:
সাম্প্রতিক বিষয়
এর দ্বারা পোস্ট করা
suMon azaD (সুমন আজাদ)
আজ ১৫ ই নভেম্বর,আন্তর্জাতিক লেখক বন্দি দিবস।১৯৮০ সালে এর গোড়া পত্তন হয় এবং একটি মেনুফেস্টো ঘোষণা করে যার মূল কথা ছিল পৃথিবীর সকল দেশের নির্যাতিত লেখক,কবি,সাহিত্যিক,মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকদের উপর সকল ধরনের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নির্যাতন যেন বন্ধ করা হয়। আর এই মেনুফেস্টোকে বাস্তবে রুপদান করার জন্য আন্তর্জাতিক পেন ক্লাব ( পোষ্ট সেকেন্ডারী এডুকেশনাল নেট ওয়ার্ক ) সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।পেন ক্লাবের ১৯২১ সালে লন্ডনে জন্ম হয় এবং পৃথিবীর সকল অত্যাচারিত লেখক,কবি,সাহিত্যিক,সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাংবাদিকদের পক্ষে এক বলিষ্ট আন্তর্জাতিক কলম সংঘ।কিন্তু এতো বলিষ্ট সংগঠন হয়ে কাজ করার পরেও দুনিয়ার দেশে দেশে কবি,সাহিত্যিক,সাংবাদিক মানবাধিকার কর্মীরা ধর্মীয় ও রাষ্টীয় প্রতিষ্ঠান দ্বারা খুন হওয়া, জেলে যাওয়া,গুপ্ত হত্যা ও নির্যাতিত হওয়া কোনো কিছুরই যেন কমতি নাই।
নীচে একটি ইন্টারন্যাশনাল পেন রাইটারস প্রিজন কমিটির এ বছরের জানুয়ারী থেকে জুন`০৯ এর চিত্র দেওয়া হলোঃ-
১) ২৮ জনের মৃত্যু ও গুপ্ত হত্যা—————-
২) ১৩৪ জনের জেল-বন্দি———–
৩) ২০৯ জনের কেস কোটে রায়ের জন্য অপেক্ষারত——–
৪) ১৩১ জন সারাক্ষন মৃত্যু হুমকী মাথায় বয়ে বেড়াচ্ছে——— এর মধ্যে যেমন,
রাশিয়ার একজন বিখ্যাত সাংবাদিক আনা পলিৎকোভস্কায়া ( ১৯৫৮-২০০৬) । তিনি রাশিয়া ও চেচনিয়ার যুদ্ধ বিরোধী ও মানবাধিকার কর্মী ছিলেন। তাকে গত ২০০৬ সালে গুপ্ত হত্যা করা হয়। লুইদিয়া কাচাও মেক্সিকোর,লি জিয়ানহং,চায়নার,চেঞ্জেরাই হোব,জিম্বাবুয়ের,বাংলাদেশের তসলিমা নাসরিন, সুমন আজাদ, সুহেল আহমেদ ও শাহারিয়ার সাকু নাম করা সাংবাদিক,লেখক,কবি যারা কি-না ২৪ ঘন্টা মৃত্যু হুমকী নিয়ে দিনানিপাত করছে।
(পত্রিকা প্রতিবেদন)
নীচে একটি ইন্টারন্যাশনাল পেন রাইটারস প্রিজন কমিটির এ বছরের জানুয়ারী থেকে জুন`০৯ এর চিত্র দেওয়া হলোঃ-
১) ২৮ জনের মৃত্যু ও গুপ্ত হত্যা—————-
২) ১৩৪ জনের জেল-বন্দি———–
৩) ২০৯ জনের কেস কোটে রায়ের জন্য অপেক্ষারত——–
৪) ১৩১ জন সারাক্ষন মৃত্যু হুমকী মাথায় বয়ে বেড়াচ্ছে——— এর মধ্যে যেমন,
রাশিয়ার একজন বিখ্যাত সাংবাদিক আনা পলিৎকোভস্কায়া ( ১৯৫৮-২০০৬) । তিনি রাশিয়া ও চেচনিয়ার যুদ্ধ বিরোধী ও মানবাধিকার কর্মী ছিলেন। তাকে গত ২০০৬ সালে গুপ্ত হত্যা করা হয়। লুইদিয়া কাচাও মেক্সিকোর,লি জিয়ানহং,চায়নার,চেঞ্জেরাই হোব,জিম্বাবুয়ের,বাংলাদেশের তসলিমা নাসরিন, সুমন আজাদ, সুহেল আহমেদ ও শাহারিয়ার সাকু নাম করা সাংবাদিক,লেখক,কবি যারা কি-না ২৪ ঘন্টা মৃত্যু হুমকী নিয়ে দিনানিপাত করছে।
(পত্রিকা প্রতিবেদন)
লেবেলসমূহ:
মানবাধিকার
,
সাম্প্রতিক বিষয়
এর দ্বারা পোস্ট করা
suMon azaD (সুমন আজাদ)
বাঙালি সমাজ ও ইউরোপীয়ান সমাজ-সংস্কৃতির মধ্যে তফাৎ অনেক। একটা পরিবেশে বেড়ে ওঠার পর আরেকটা নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াটা সহজ নয়। ফলে একজন বাঙালির নি:সঙ্গ প্রবাস জীবন খুবই কষ্টের। জার্মানির এক বছরের জীবনে বহু বাঙালির সঙ্গে দেখা হয়েছে। পরিচয় ঘটেছে অনেকের সঙ্গে। কিন্তু সম্পর্কের দৃঢ়তা বা গভীরতা খুব কম জনের সাথেই হয়েছে। আবার বাঙালি সমাজে বেড়ে ওঠা মানুষ আমরা। আমাদের মধ্যে হিংসা, জেলাসি, পরনিন্দা এসব দ্রুত ডালপালা ছড়ায়। রাজনৈতিক বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর পছন্দ-অপছন্দের ওপর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আবার এসব কর্মকান্ডের ওপর পারস্পরিক সম্পর্কে চিড় ধরে। বাঙালিরা সচরাচর কর্মের ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণকর দিক নিয়ে কারও মূল্যায়ণ করেন না। কে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত? সেটার ওপরই নির্ভর করে অনেকে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন।
বাস্তব জীবনে এটার সত্যতা অনুবাধন করলাম এই প্রবাসে এসে। ব্যতিক্রম যে নেই তা বলতে পারি না। এক্ষেত্রে জীবন্ত উদাহরণ দিতে পারি আবদুল্লাহ আল-হারুণের। যিনি তিন দশক যাবত জার্মানে বসবাস করছেন। তার মত মানুষদেরকে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়। কী দুর্ভাগ্য আমাদের! অথচ যিনি বাংলাদেশকে অনেক কিছু দিতে পারতেন। যা থেকে বাঙালি সমাজ বঞ্চিত হলো। তিনি যদি বাংলাদেশে থাকতেন? হয়ত আজ জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন কিংবা হুমায়ূন আহমেদকে ছাড়িয়ে যেতেন! কিংবা খ্যাতিমান প্রয়াত নাট্যকার আবদুল্লাহ আল-মামুনের খ্যাতিকেও ছাপিয়ে যেতে পারতেন তার কর্মগুণে। আবদুল্লাহ আল-হারুণ অবশ্য তারই অনুজ সহোদর। আবার কেউ যদি রাষ্ট্রীয় বাহিনী কিংবা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী অংশের অপছন্দের হন। অথবা যিনি ডান পক্ষেও নেই আবার বামপক্ষেরও নন। বাঙালি হিসেবে তার মত অভাগা বোধহয় এজগতে আর কেউ নেই। বাংলাদেশের মত সমাজে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না থাকলে টিকে থাকা খুবই কঠিন। সম্প্রতি বার্লিনে আমাকে এই সত্যটা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের এক সুহৃদ।
যাহোক, আজকের লেখার প্রসঙ্গ এটা নয়। লেখক আবদুল্লাহ আল-হারুণ প্রবাস জীবনে আমার একজন বড় বন্ধু, অভিভাবক। তার সাথে আমার বয়সের দিক ধরলে বলতে হবে পিতা-পুত্রের মত সম্পর্ক। তার মাধ্যমেই কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক শওগাত আলী সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে আমার। তিনি অনলাইন সংবাদপত্র নতুন দেশ এর প্রকাশক এবং তার স্ত্রী সেরিন ফেরদৌস সম্পাদক। উভয়ই পেশাদার সাংবাদিক। বাংলাদেশে থাকতে কারও সঙ্গেই আমার সরাসরি যোগাযোগ হয়নি কোনদিন। কিন্তু উভয়ের রিপোর্টই আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করতো। তাদের রিপোর্টের সঙ্গে ছিল আমার এক ধরণের গভীর সম্পর্ক। নতুন দেশে প্রকাশিত আবদুল্লাহ আল হারুণের একটি লেখা সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করি। এটা করতে গিয়ে শওগাত ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ই-মেইল যোগাযোগের মাধ্যমে। খুব বেশিদিনের কথা নয় এটি। মার্চের ১০ কিংবা ১২ তারিখে (২০১০) প্রথম যোগাযোগ সাগর ভাইয়ের সঙ্গে। নতুন দেশ পত্রিকার প্রথম বর্ষ সংখ্যা ৩৮, ২১ এপ্রিল, ২০১০ সংখ্যায় একটি লেখা ছাপা হয় জনৈক আবুর রহিম মজুমদারের নামে। শিরোনাম ছিল বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন।
ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন সংক্রান্ত যেকোন ধরণের রিপোর্ট বা লেখার প্রতি আমার আগ্রহ একটু বেশি। তাই লেখাটি মনোযোগ আকর্ষণ করে আমার। কিন্তু প্রথম প্যারা পড়ার পরই লেখার সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক মনে হতে লাগলো। এবং লেখাটি পুরো একবার পড়ার পরই বুঝতে পারি এটা আমার লেখা। হুবহু আমার এই লেখাটিই ভিন্ন শিরোনামে ছাপা হয় বাংলাদেশের প্রাচীন সংবাদপত্র দৈনিক সংবাদে। সেই আমার লেখাটি ছাপানো হয় নতুন দেশে। ২০০৯ সালের ১৬ জুলাই দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার লেখাটির শিরোনাম ছিল ”সাহসী সাংবাদিক শামছুর রহমান হত্যা দিবস এবং বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন”। দ্রুত একটা ই-মেইল পাঠালাম সাগর ভাইকে। তিনি স্বস্তিমূলক একটা উত্তর দিলেন তড়িৎ বেগে। তারপরেই দেখা গেলো লেখাটি ডিলিট করে দেয়া হয়েছে। আমি যদি কারও লেখা হুবহু নকল করে নিজের নামে কোথাও পাঠাই। তবে কোন সম্পাদক-বার্তা সম্পাদক বা প্রকাশকের পক্ষেই তা আঁচ করা সম্ভব নয়। নকল বা চুরির বিষয়টি তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষপে নিশ্চিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। যেটা বাস্তবে করে দেখালেন প্রিয় শওগাত ভাই ও সেরিন আপা। পেশাদারি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এটা একটা নজির। ধন্যবাদ নতুন দেশ কর্তৃপক্ষকে। নতুন দেশ পরিবারের সাথে একটা গভীর আত্মিক সম্পর্ক অনুভব করি আমি। আশা করি এই সম্পর্কের ধারা বহমান রইবে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল ও প্রিয় পাঠকদের কাছে বাংলাদেশের প্রেসফ্রিডমের একটা চিত্র তুলে ধরতে চাই। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে মাত্র। তখন আমি কলেজে পড়ি। শিক্ষানবিশ রিপোর্টার হিসেবে দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে কাজ করি দৈনিক বাংলায়। তখনই দৈনিক বাংলা কার্যালয়ে পরিচয় দু:সাহসী দেশপেমিক সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় শামছুর রহমান কেবলের সঙ্গে। ১৬ জুলাই তাঁর হত্যাবার্ষিকী। ২০০০ সালের এই দিনে দুর্বৃত্তরা তাঁকে হত্যা করে বুলেটের আঘাতে। তখন তিনি দৈনিক জনকণ্ঠে কাজ করেন যশোর থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন করার লক্ষ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এরপর দৈনিক বাংলা ছেড়ে যোগ দিই দৈনিক সংবাদে। তখন পরিচয় হয় সাংবাদিক মানিক সাহার সঙ্গে। খুলনা থেকে তিনি সাংবাদিকতা করতেন। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভয়াবহ সন্ত্রাস, তান্ডব দেশবাসিকে ভাবিয়ে তুলতো। এই অপশক্তি আমাকে বারবার হত্যার হুমকি দেয়। মানিক সাহা বলতেন, ”আকাশ বেশি রিস্ক নিও না। সাবধানে থেকো। ওরা (শিবির) খুব ভয়ংকর।” এই অকুতোভয় জনদরদী সাংবাদিক আর নেই আমাদের মাঝে। বোমার আঘাতে এই দেশপ্রেদিকের মাথার খুলি উড়িয়ে দিয়েছিল দুর্বৃত্তচক্র। আজও জ্বল জ্বল করে ভেসে ওঠে মানিক সাহার সেই রক্তাক্ত ছবিটা। তার মাথার মগজ সেদিন উড়ে গিয়েছিল বোমার আঘাতে। রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল তার দেহটা। রাস্তার ওপরে নিথর হয়ে পড়ে থাকা দেহ যেন গোটা বাংলাদেশ। পর্শিয়া ও নাতাশাতো আর কোনদিন বাবা ডাকতে পারবে না। মানিক সাহার দুই কন্যা। নন্দা বউদির চোখের জল মুছে গেছে। কিন্তু হৃদয়ের যে ক্ষরণ তা কী কোনদিন বন্ধ হবে?
মুক্ত গণমাধ্যমতো পরের কথা সাংবাদিকদের জীবনেরই কোন নিশ্চয়তা নেই। সন্ত্রাস, রাজনীতি ও সমাজনীতির সব তথ্যের জীবন্ত ভান্ডার ছিলেন কেবল ভাই। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জীবনে দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘুরে নতুন বছর আসে। কিন্তু সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের বিচার হয় না। দেশে ”সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক” নামধারী একটা নির্বাচিত সরকার আছে। এটা আবার মহাজোট সরকার নামে বেশি পরিচিত। কিন্তু সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন বন্ধ হয়নি। বন্ধ করা যায়নি বিনা বিচারে মানুষ হত্যা। মাত্র ক’দিন আগে চলে গেলো ফরিদপুরের সাংবাদিক গৌতম দাসের হত্যা দিবস। আদালতে আত্মসমর্পণকারি একজন অভিযুক্ত খুনি (গৌতম হত্যার) কী করে পালিয়ে যায়? এটা আমাদের জানা নেই। তবে দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার আছে বলে মনে হয় না। থাকলে অন্তত সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন বন্ধ হতো। বিচার পেতো নির্যাতিত ও নিহত সাংবাদিক পরিবারগুলো।
গণতন্ত্র ছাড়া গণমাধ্যম স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। মানবাধিকারও থাকে না। অসাম্য আর অন্যায্যের পৃথিবীতে সাংবাদিকতা দিন দিন ঝঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ও অশান্ত দুনিয়ায় সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন নতুন কোন বিষয় নয়। তাইতো বিশ্বময় প্রেসের স্বাধীনতা তথা প্রেস ফ্রিডম বা মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য আওয়াজ তীব্র হচ্ছে ক্রমশ:। এই আওয়াজ গণমাধ্যমের গন্ডি পেরিয়ে নাগরিক সমাজের বৃহৎ অংশকেও টানতে সক্ষম হয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র অসহায়। গণমাধ্যম ও গণতন্ত্র একে অপরের পরিপুরক। বিশ্বে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকতার ঝুঁকিটা চরমে পৌঁছেছে। আর বাংলাদেশেতো প্রায় প্রতিনিয়ত সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম রাষ্ট্রযন্ত্রের খবরদারি, নিপীড়নের মধ্যেই আছে।
জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে রক্ষা করা গণমাধ্যমের প্রধান কাজ। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। অধিকারহারা শোষিত বঞ্চিত অসহায় মানুষদের পক্ষে গণমাধ্যম সর্বদা সোচ্চার। সমাজপতি, রাষ্ট্রনায়কদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার মহান দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে গণমাধ্যম। সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে সাংবাদিকরা শত প্রতিকুলতার মধ্যেও কাজ করছেন। বাংলাদেশে তিন’টি জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে। দুর্নীতি, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা লুটপাট নিয়ে খবর বেরুলেই হলো। সাংবাদিক আর যায় কোথায়? সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের খবর হয়ে যাবে। একই কারণে সাংবাদিককে মন্ত্রি-এমপিদের অথবা রাজনৈতিক প্রভাবশালি মহলের খপ্পড়ে পড়তে হবে। গণমাধ্যমকর্মীদের, প্রভাবশালিদের রোষানলে পড়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। হত্যা-নির্যাতন, হয়রাণি, গ্রেফতার, মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে বন্ধুর করে তুলেছে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকদের জন্য জীবন খুব বিপদজনক। কারণ সাংবাদিকরা মানুষের কথা বলেন। মানুষের বিপদ হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করে গণমাধ্যম। রাজনৈতিক দূুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি-দু:শাসনের কথা তুলে ধরেন সাংবাদিকরা। ফলে সাংবাদিকদের উপরেই সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের কষাঘাত এসে পড়ে। যেসমস্ত সাংবাদিক বা মিডিয়া মানুষের নিগ্রহের বিরুদ্ধে কথা বলতে চেষ্টা করেন। কিংবা যারা মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেন তাদের উপরেই সবচেয়ে বেশি অত্যাচার নেমে আসে। এখানে আমরা উদাহরণ দিতে পারি একুশে টেলিভিশন (বন্ধ হবার আগেকার একুশে টিভির কথা বলা হচ্ছে) এবং সিএসবি নিউজ এর। একুশে টিভি এবং সিএসবি নিউজ এই দু’টি টিভি চ্যানেল ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন ছল-ছুতোয় সরকার এই বৃহৎ দু’টি টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও আদালতের রায়ের মাধ্যমে পরে একুশে টেলিভিশন পুনরায় চালু হয়েছে। বাংলাদেশে প্রেসফ্রিডম এর আরও খবর হলো আরেকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার টেলিযোগাযোগ আইন লংঘন’র অভিযোগে চ্যানেল ওয়ান এর সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় ২৭ এপ্রিল, ২০১০ সন্ধ্যায়। (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ২৮ এপ্রিল, ২০১০)। একই দিনের সংবাদ’ এর দেশ পাতায় আরেকটি খবরের শিরোনাম হলো ”মানিকগঞ্জ সংবাদ প্রতিনিধিকে পৌর মেয়রের প্রাণনাশের হুমকি: থানায় জিডি”।
রিপোর্টের ভাষ্য মতে, দুর্নীতি বিষয়ক একটি অভিযোগের বিষয়ে মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা রমজান আলীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন সাংবাদিক মুহম্মদ আবুল কালাম বিশ্বাস। এসময় মেয়র সাংবাদিককে বলেন, ”তুই যদি আর পত্রিকায় আমার ও আমার পরিবার নিয়ে কোন সংবাদ প্রকাশ করিস তবে তোকে প্রাণে মেরে ফেলা হবে। আগেও তুই আমার ভাইকে নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করেছিস। আমি তখন আমার লোকজন নিয়ে তোকে খুঁজেছি, কিন্তু তোকে পাইনি। তাই তুই প্রাণে বেঁচে গেছিস। পত্রিকায় আর যদি কোন সংবাদ আমাকে নিয়ে লিখিস, তাহলে আমি তোর ও তোর পরিবারের ক্ষতি করবো।”
বাংলাদেশে প্রেসফ্রিডমের সর্বষে খবর হলো-দৈনিক আমার দেশ এর প্রকাশনা বন্ধ। ১ জুন, ২০১০ সরকার এক ঠুনকো অজুহাতে বিরোধী শিবিরের সমর্থক এই পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। একই রাতে সরকার আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে (যদিও তিনি পেশাদার কোন সাংবাদিক নন, তবে বাংলাদেশে বহু অপেশাদার মানুষ মিডিয়া অঙ্গনের নামকরা ব্যক্তিত্ব) গ্রেফতার করে। বাংলাদেশের প্রাচীন ইংরেজী দৈনিক অবজারভার বন্ধ হয়ে গেছে জুন (২০১০) মাসেই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস ও সাপ্তাহিক বিচিত্রা বন্ধ করে দেয়। আওয়ামী লীরে নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারই ২০০৯ সালের ১৫ অক্টোবর পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু করে। কিন্তু কথিত অনিয়মের অভিযোগে ১৯ নভেম্বর, ২০০০৯ সরকার যমুনা টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়।
বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের শেষ নেই। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন যেন এক মামুলি ব্যাপার সেখানে। ময়মনসিংহের গফরগাঁয়ে দৈনিক সমকালের বিপ্লবের হাত-পা ভেঙ্গে দেয়া হয় জোট সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই। অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য সরকার দলীয় একজন সংসদ সদস্যের প্রত্যক্ষ মদদে এ ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ। সেই ঘটনার সর্বশেষ কী অবস্থা তা আমরা আজও জানি না। ঢাকার উত্তরায় কমিউনিটি বেইসড একটি পত্রিকার তরুণ রিপোর্টার নূরুল ইসলাম রানা খুন হয়েছেন। এটা ২০০৯ সালের ৩ জুলাইয়ের ঘঁনা। বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলই ৫ সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। নিহত সাংবাদিকরা হলেন ফতেহ ওসমানী, শফিকুল ইসলাম মিঠু, আবদুল হান্নান, আহসান বারী ও নূরুল রানা। আর জরুরি অবস্থায় এই লেখক (জাহাঙ্গীর আলম আকাশ) ছাড়াও দ্য ডেইলি স্টারের তাসনীম খলিল নির্যাতিত হন সেনাবাহিনী ও র্যাবের হাতে। জরুরি অবস্থা চলাকালে সিলেট, বান্দরবান, নীলফামারীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিদের বিরুদ্ধে হয়রাণিমূলক মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর সামরিক শাসন দেশের মানুষের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে। বহু লড়াই-সংগ্রাম আর আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। মুক্তি পায় গণতন্ত্রের পায়রা। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মানুষ ফিরে পায় স্বাধীনতার পুন:স্বাদ। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্টিত হয় জেনারেল জিয়াউর রহমানের গড়া দল বিএনপি। ক্ষমতায় এসেই বিএনপি সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। সরকারি মালিকানাধীন সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থা, গণমাধ্যম থেকে বিএনপির কাছে ‘অপছন্দনীয়’ সাংবাদিকরা গণছাঁটায়ের শিকার হন। কোন রকমের টার্মিনেশন বেনিফিট ছাড়াই বিএনপি সরকার ছাঁটাই করে দৈনিক বাংলার তৎকালীন সম্পাদক তোয়াব খান, তৎকালীন সাপ্তাহিক বিচিত্রার নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার কবিরসহ ১৪ জন সিনিয়র সাংবাদিককে।
২০০২ সালের নভেম্বর মাসের কথা। বিবিসি চ্যানেল ফোরের জন্য একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন বিদেশী সাংবাদিক জাইবা মালিক ও ব্রুনো সরেনটিনো। এই ’অপরাধে’ বিএনপি সরকার সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন করে। ব্রিটিশ ও ইতালীয় এই দুই সাংবাদিকসহ বাংলাদেশের শাহরিয়ার কবির, সালিম সামাদ ও পিসিলা রাজকে গ্রেফতার করা হয়। ময়মনসিংহের সিনেমা হলে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এর সাথে জড়িত করে গ্রেফতার করা হয় বাসস’র সাংবাদিক এনামুল হক চৌধুরী ও বিশিষ্ট কলামিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুনকে। আটকাবস্থায় বিএনপি সরকার সাংবাদিকদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়েছিল বলে অভিযোগ।
২০০৯ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকের ঘটনা। দৈনিক সংবাদের ধামরাই প্রতিনিধি শামীম পারভেজ খানকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় দুর্বৃত্তরা। এলাকার নিরীহ লোকদের বিভিন্ন মিথ্যা মামলা থেকে বাঁচতে সহায়তা করার করেন এই সাংবাদিক। এতেই ক্ষুব্ধ হয় স্বার্থান্বেষী মহল। হুমকির বিষয়ে থানায় জিডি হলেও সন্ত্রাসীরা গ্রেফতার হয়নি। একই মাসের শুরুর দিকে ঘটে আরেক ঘটনা ময়মনসিংহে। গফরগাঁওয়ে দৈনিক সমকাল প্রতিনিধি শামীম আল আমিন বিপ্লবের ওপর আক্রমণ করা হয়। সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমদ এর ক্যাডার বাহিনী বিপ্লবের হাত-পা ভেঙ্গে দেয়। ২২ অক্টোবর (২০০৯) বাড়ির ভেতরে বর্বর নির্যাতনের শিকার হন সাংবাদিক এফ এম মাসুম। র্যাব সদস্যরা তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে। তিনি নিউ এজ পত্রিকার রিপোর্টার। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিষয়ে রিপোর্ট করেছিলেন। যার কারণে তাকে নির্যাতিত হতে হয়।
২০০৬ সালের ১৬ এপ্রিল মাস। চট্রগ্রামে বাংলাদেশ ও অষ্ট্রেলিয়ার মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল। খেলার মাঠের তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ চালায় নির্মমতা। পুলিশ বাহিনী সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। পুলিশের তৎকালীন ডিসি আলী আকবরের নেতৃত্বে অন্ত:ত ৩০ জন সাংবাদিক আহত হন। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায় নিযুক্ত প্রবীণ আলহাজ্ব জহিরুল হক। তাকেও সেদিন পুলিশ যেভাবে আক্রমণ করেছিল তা কোন সভ্য সমাজে ভাবাই যায় না। পুলিশ রাইফেলের বাঁট দিয়ে সাংবাদিকদের পিটিয়েছে। সাংবাদিক সমাজের আন্দোলন তুঙ্গে এই ঘটনার প্রতিবাদে। তখন তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ঘটনা তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করেছিল। সেই রিপোর্ট আজও আলোর মুখ দেখেনি। হামলাকারী পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্যান্যরা কেউই শাস্তি পাননি আজও।
২০০৬ সালের ২৯ মে। কুষ্টিয়ায় তৎকালীন সরকার দলীয় সেখানকার সংসদ সদস্য সাংবাদিকদের ওপর লেলিয়ে দেয় সন্ত্রাসী। সেই ক্যাডার বাহিনী হামলা করে সাংবাদিকদের সমাবেশে। নির্যাতনবিরোধী ওই সমাবেশে হামলায় গুরুতর আহত হন বিশিষ্ট সাংবাদিক বাংলাদেশ অবজারভার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। আমাদের স্মৃতিতে আজও সেই রক্তাক্ত ইকবাল সোবহান চৌধুরীর ছবি ভেসে ওঠে। সন্ত্রাসী ক্যাডারদের কোন শাস্তি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।
সাংবাদিকতাই আমার পেশা এবং নেশা। সার্বক্ষণিক ধ্যাণ, চিন্তা-চেতনার মধ্যেই আছে আমার সাংবাদিকতা। মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা। জনকল্যাণ ভাবনা। মানুষের ওপর যে অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার। এসব নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই হলো আমার জীবনের জন্য কাল। নন পার্টিজানশিপ সাংবাদিকতা করার এবং সর্বদাই ইনভেষ্টিগেটিভ জার্নালিজম করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি কখনই ভাবতে পারি না নির্যাতিত হবো নিজেই। কল্পনাও করিনি কোনদিন এমনটা। অন্যায়-অবিচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে নিজেই রাষ্ট্রীয় বর্বরতার শিকার হলাম।
অন্যায়-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমি রিপোর্ট করেছি। সেইরকম নির্যাতনই আমার জীবনটাকে পাল্টে দেবে? এটা ভাবনায় ছিল না আমার। আজকে আমি একটা কঠিন বাস্তবতা কিংবা সত্যের মুখোমুখি। এক ধরনের একটা অনিশ্চয়তা একটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে আমার জীবনটাকে। আমি জানি না এ অবস্থার অবসান হবে কিনা? কারণ আমরা একটা অসভ্য-বর্বর সমাজের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। একটা অপশক্তি এই সমাজকে সবসময় অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে চায়। যে অপশক্তি দিন দিন সমাজকে আবৃত করে ফেলছে। আমরা জানি, শত হয়রাণি, নির্যাতন ও হুমকিতেও জনজোয়ারের ঢেউ আটকানো যায় না। তেমনি কোন কোন মানুষকে আদর্শচ্যুত করা যায় না। অত্যাচার, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও অপশক্তি কখনই সত্যকে নিভিয়ে দিতে পারে না। তেমনি বাংলাদেশের সত্যান্বেষী কলম সৈনিকদেরর দমানো যাবে না হত্যা-নির্যাতন করে।
বাংলাদেশের যে বাস্তবতা তাতে আমাদের বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেই নির্যাতন জড়িয়ে আছে। অত্যাচার বা নিপীড়ন বিষয়টা শক্তভাবে গ্রোথিত। মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই (ব্যতিক্রম ছাড়া) নিয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্রসফায়ারের মত মানব হত্যার জঘন্য ঘটনাকে। পুলিশ, র্যাব বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হেফাজতে হত্যা-নির্যাতন একটা সাধারণ ব্যাপার। নির্যাতনের প্রেক্ষিতে মৃত্যুর পরও সমাজ কোন উচ্চবাচ্চ করে না। সরকার সবসময় এসব অপকর্মকে বৈধতা দিয়ে আসছে। অন্যকথায় দায়মুক্তি দিচ্ছে। নির্যাতনকারি-খুনির দল হচ্ছে পুরস্কৃত। এখানে মিডিয়ার ভূমিকাও প্রশ্নবোধক। মিডিয়া তোতাপাখির ন্যায় ক্রসফায়ার বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের পক্ষ নিচ্ছে। মিডিয়া বাধ্য হয়ে করুক আর স্বেচ্ছায় করুক এটা দেখছি আমরা। ক্রসফায়ারকারিদের প্রেসবিজ্ঞপ্তিটি ছেপে দিতে কার্পণ্য করে না আমাদের গণমাধ্যম। অবশ্য যারা সাহস নিয়ে দু’একটি রিপোর্ট করেন তারা পড়েন চরম বেকায়দায়। তাদের হয় নির্যাতিত না হয় চাকুরিচ্যুত হতে হয়।
জাতির বিবেক, জাতিকে যারা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন তারাই হলেন সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মী। সেই সাংবাদিকদের উপরে র্যাবের নির্যাতন চরমে এসে পৌঁছায় জরুরি অবস্থার সময়ে। তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমি নিজেই। আর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের উদাহরণ অনেক আছে। আমাদেরই সাহসী সাংবাদিক বিশিষ্ট কলামিষ্ট মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব শাহরিয়ার কবির স্বয়ং এক বড় উদাহরণ। শাহরিয়ার কবিরের ওপর বর্বর রাষ্টীয় নির্যাতন হয়েছে। আজও তিনি তার শরীরে সেই ক্ষতচিহ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একই অবস্থা এই লেখক এবং নিউ এজ এর মাসুমের। কিন্তু তারপরও আমরা চাই, আর কেউ যেন নির্যাতনের মাধ্যমে কিংবা বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার না হয়। দেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের কিঞ্চিৎ খতিয়ান তুলে ধরা যাক এবার। মানিক সাহা ছিলেন খ্যাতিমান সাংবাদিক। তিনি দৈনিক সংবাদ, নিউ এজ, বিবিসি ও বন্ধ হয়ে যাওয়া একুশে টেলিভিশন এর প্রতিনিধি ছিলেন। সন্ত্রাসীরা তার পর বর্বর ও নৃশংস বোমা হামলা চালায় ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে। ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন খুলনা প্রেসক্লাবের অনতিদূরে। এমন নৃশংস কায়দায় সাংবাদিক হত্যার নজির নেই আমাদের দেশে। মানিক সাহা হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশ জুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই হত্যাকান্ডের প্রকৃত খুনিরা আজও ধরাছোয়ার বাইরে।
২০০৪ সালের ২ মার্চ দি নিউ এজ পত্রিকার খন্ডকালীন সাংবাদিক কেরানীগঞ্জের আবদুল লতিফ নাবিলকে জবাই করে হত্যা করা হয়। স্ত্রী ফারহানা সুলতানা কনকের পরকীয়া প্রেমে বাধা দেয়ার কারণে এই হত্যাকান্ড ঘটে বলে অভিযোগ। স্ত্রীর প্রেমিক নির্জন মোস্তাকিন, মোস্তাকিনের বন্ধু শহিদুল ইসলাম পাপ্পু ও নাবিলের স্ত্রী কনক মিলে নাবিলকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরবর্তীতে মোস্তাকিন, পাপ্পু ও স্ত্রী কনককে পুলিশ গ্রেপ্তার করলে মামলার কী অবস্থা? এটা আমাদের জানা নেই। দৈনিক জন্মভূমি সম্পাদক ও খুলনা প্রেসক্লাব সভাপতি ছিলেন হুমায়ূন কবির বালু। ২০০৪ সালের ২৭ জুন খুলনায় সন্ত্রাসীরা বোমা মেরে হত্যা করে তাকে। একই সালের ২১ আগস্ট রাতে সন্ত্রাসীরা কামাল হোসেনকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে জবাই করে হত্যা করে। তিনি ছিলেন খাগড়াছড়ির মানিকছড়ির আজকের কাগজ প্রতিনিধি ও উপজেলা ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক।
বগুড়ার দূর্জয় বাংলার নির্বাহী সম্পাদক ও বিএফইউজে সহ-সভাপতি দীপংকর চক্রবর্তী (৫৯)। তাকে একই বছরের ২ অক্টোবর হত্যা করা হয়। শেরপুরের সান্যালপাড়ার নিজ বাড়ির পাশেই সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এই সৎ সাংবাদিককে। ঢাকার কাঁটাবনে ২০০৪ সালের ২৪ অক্টোবর নিহত হন আরেক সাংবাদিক। দৈনিক এশিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা অফিসে ঢুকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে শহীদ আনোয়ার অ্যাপোলো (৩৫) কে। অ্যাপোলো ওই পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক বলে তার পকেট থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকান্ড ঘটে থাকতে পারে বলে জানা গেছে। ২০০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি খুলনা প্রেসক্লাবে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে দৈনিক সংগ্রাম’র খুলনা ব্যুরো প্রধান শেখ বেলালউদ্দিনকে নিহত ও আরও ৪ সাংবাদিক আহত হন। একই বছরের ২৯ মে দিবাগত মধ্য রাতে কুমিল্লায় দৈনিক কুমিল্লা মুক্তকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মুহাম্মদ গোলাম মাহফুজ (৩৮) নিহত হন। তাকে জবাই করে হত্যা করে সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তরা।
সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হয়েছেন ফরিদপুরে সমকালের প্রতিনিধি গৌতম দাস, যশোরে দৈনিক রানারের গোলাম মাজেদ, খুলনায় হারুন-অর রশিদ খোকন, দৈনিক জন্মভূমির হুমায়ুন কবির বালু, দৈনিক সংবাদের মানিক সাহা, রাঙ্গামাটির জামালউদ্দিন, ঝিনাইদহের মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপ, দৈনিক সংগ্রামের শেখ বেলালউদ্দিন, নহর আলী, শুকুর আলী হোসেন, নারায়ণগঞ্জের আহসান আলী, মৌলভীবাজারের ফারুক আহমেদ, নীলফামারীর নীলসাগরের মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, সাতক্ষীরার শ.ম.আলাউদ্দিন, যশোরের দৈনিক জনকণ্ঠের শামছুর রহমান কেবল, সাইফুল আলম মুকুল। সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকারকর্মীদের ওপর নির্যাতনের একটি ঘটনায়ও নির্যাতনকারির শাস্তি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। জোট আমলে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে বিশিষ্ট কলামিষ্ট অধ্যাপক মুনতাসির মামুন, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, এনামুল হক চৌধুরী সালিম সামাদ রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জোট আমলে নির্যাতিত হয়েছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, আলহাজ্ব জহিরুল হক। নির্যাতিত হয়েছেন সাংবাদিক প্রবীর শিকদার, টিপু সুলতান।
বিগত ১৭ বছরে বাংলাদেশে প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক ডক্টর হুমায়ূন আজাদসহ ৩১ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। ২০০৯ সালের ৩ জুলাই সাংবাদিক নূরুল ইসলাম রানা সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন ঢাকার উত্তরায়। বর্তমান সরকারের আমলে নিহত হয়েছেন সাংবাদিক আবদুল হান্নান (ডেমরা, ঢাকা) ও এম এম আহসান বারী (গাজীপুর, ঢাকা)। বেসরকারি সংগঠন অধিকারের রিপোর্ট মতে, ২০০৯ সালে দেশে ৩ জন সাংবাদিক নিহত, ৮৪ জন আহত, ৪৫ জন লাঞ্ছিত, ১৬ জন আক্রান্ত, একজন গ্রেফতার, দুইজন অপহরণ, ৭৩ জন হুমকির শিকার, ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা, ১৯ জন অন্যান্য ঘটনায় আক্রান্ত হন। ৪১ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে ৩৮ জন সাংবাদিক আহত, ২৬ জন হুমকির শিকার, ১৭ জন লাঞ্ছিত, একটি সংবাদপত্র কার্যালয় ও ৮ জন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলে তৎকালিন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী সাংবাদিক পিটিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনায় ওঠে আসেন। বার্তা সংস্থা ইউএনবির তৎকালিন ফেনী প্রতিনিধি টিপু সুলতানের ওপর হাজারীর ক্লাস কমিটির সদস্যরা হামলা করে। তখন তৎকালিন প্রধানমন্ত্রি (যিনি বর্তমানেও প্রধানমন্ত্রি) শেখ হাসিনা পরোক্ষভাবে সাংবাদিক নির্যাতনকারির পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, টিপু সুলতানের কী কোন এক্রিডিটেশন কার্ড আছে? ওটা ছাড়া কী সাংবাদিক হওয়া যায় নাকি? অথচ বাংলাদেশের শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ সাংবাদিকের কোন এক্রিডিটেশন কার্ড নেই। যদিও এই কার্ড দেয়া নিয়েও রয়েছে নানান কথা। সে প্রসঙ্গ থাক আজ।
দেশে আলোচিত সাংবাদিক হত্যাকান্ডগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও বহুল আলোচিত হলো মানিক সাহা, শামছুর রহমান কেবল, হুমায়ুন কবির বালু, দীপংকর চক্রবর্তী, গৌতম দাস, হারুন রশিদ খোকন, সাইফুল আলম মুকুল, শেখ বেলালউদ্দিন। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বহু সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। এরমধ্যে দৈনিক জনকণ্ঠের সম্পাদক প্রকাশক মুক্তিযোদ্ধা আতিকউল্লাহ খান মাসুদ, জাহাঙ্গীর আলম আকাশ, তাসনীম খলিল, কার্টুনিষ্ট আরিফুর রহমান প্রমূখ উল্লেখযোগ্য। তত্ত্বাবধায়ক আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের তুচ্ছ ঘটনা ঘটে। এরই জের ধরে সেনাবাহিনী দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ছাত্রদের ওপর নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল প্রগতিশীল শিক্ষক-শিক্ষার্থী মৌন মিছিল করেন। এই অজুহাতে তৎকালিন সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নামে রাজনৈতিক হয়রাণিমূলক মামলা চাপিয়ে দেয়।
প্রথাবিরোধী বিশিষ্ট নাট্যকার-অভিনেতা, কলামিষ্ট মলয় ভৌমিক। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করেছেন। এখন নিয়মিত কলাম লিখেন দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলো, যুগান্তরসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে। তার ”উত্তরের উলুখাগড়া” শীর্ষক কলাম দৈনিক সংবাদ এর জনপ্রিয় কলাম ছিল। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বয়সী নাট্য সংগঠন অনুশীলন নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও সঙ্গীত বিভাগের চেয়ারম্যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের মত শায়ত্বশাসিত একটি ক্যাম্পাসে নির্যাতনবিরোধী মৌন র্যালি করার অপরাধে বর্বর নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন তিনি। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হয়নি।
সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনাগুলো নতুন নয়। জরুরি অবস্থার সময় সাংবাদিকদের আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। সাংবাদিকদের যেভাবে পর্যুদস্ত করা হয়েছে তার প্রতিকার সাংবাদিক সমাজ কার্যকরভাবে চাইতে পেরেছে কিনা? সেটাও আজকে একটা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। সাংবাদিকদের বিভাজন, সাংবাদিকতা পেশার রাজনীতিকরণ, সুশাসনের অভাব, কার্যকর গণতন্ত্রহীনতা, সুবিধাবাদিতা, বৈষম্য, ধনিক পুঁজি অভিমুখী গণমাধ্যমসহ নানা কারণে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের কোন প্রতিকার হয়নি আজও।
সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের প্রতিকার না পাবার পেছনে আরেকটি শক্তিশালী কারণ বিদ্যমান। সেটা হলো-দলীয় সাংবাদিকতা। আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের আমলে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন হলে আওয়ামী তথা মহাজোট সমর্থক সাংবাদিকরা নিরব হয়ে যান। বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে যারা সোচ্চার থাকেন রাজপথে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের প্রতিবাদে। অন্যদিকে আবার বিএনপি-জামায়াত আমলে শত সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন হলেও বিএনপি-জামায়াতপন্থি সাংবাদিক সমাজ মুখে কুলুপ আটে। যারা মহাজোটের আমলে মহাবিপ্লবী সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে।
সাংবাদিক কিংবা সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট। যেকোন হেফাজতে কোন নাগরিককে নির্যাতন সভ্য সমাজে চলতে পারে না। সাধারণ নাগরিক হোক অথবা রাজনীতিবিদ হোক কিংবা পেশাজীবি হোন বা গণমাধ্যমকর্মী হোন কারও কোন নির্যাতনের ঘটনা যেন আর না ঘটে। সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে এটা আমাদের দাবি। যদি এই ধরনের কোন ঘটনা ঘটে তার সুষ্ঠু তদন্ত করা প্রয়োজন। যারা এমন নির্যাতনের সাথে জড়িত থাকবে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় আনতে হবে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সংঘটিত সকল সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনার কার্যকর তদন্ত চাই। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনায় দোষিদের বিচারের মুখোমুখি আনয়ন অত্যন্ত জরুরি। কেননা, সভ্য সমাজে মানব হত্যা-নির্যাতন কল্পনাও করা যায় না।
বাংলাদেশের সমাজ যদি আদর্শভিত্তিক পরিবর্তিত না হয় তাহলে প্রেসফ্রিডমটা মূলত: সোনার হরিণ ছাড়া আর কিছুই নয়। দেশের মানুষ দেখেছেন, দুর্নীতিবাজরা সব সরকারের আমলেই নিয়ন্ত্রিত। আর এসব দুর্নীতিবাজ কিংবা কালো টাকার মালিকরাই বাংলাদেশে মিডিয়ার ওনারশিপের জায়গাটা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মিডিয়াকে ঘোষণা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কালো টাকার মালিক মিডিয়ার ওনারশিপে থাকায় তাদের মধ্যে একেবারেই ব্যতিক্রম ছাড়া কোন ইডিওলজি নেই। ফলে সাংবাদিকরা প্রথমত: সেলফসেন্সরশিপের মুখে পড়ে। সরকারি বিজ্ঞাপনকে ঘিরে দেশে মুড়ি-মুড়কির মত সংবাদপত্র বেরিয়েছে। এর কতগুলো জনগণের কল্যাণে কাজ করছে তাও আজ একটি বড় প্রশ্ন। সরকারের তরফ থেকে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের একটি অন্যতম বড় হাতিয়ার হলো বিজ্ঞাপন। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। তাছাড়া পেশাদারিত্বের সংকট বাংলাদেশে প্রেসফ্রিডমের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম বাধা।
দেশে প্রেসফ্রিডমের আরও একটা সমস্যা হলো কনটেম্পট টু কোর্ট এবং মানহানি। এ বিষয়ক সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা না থাকায় গণমাধ্যমকর্মীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক-প্রকাশকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ উঠেছে। কোনটা লিখলে আদালত অবমাননা হবে? তার কোন সৃনির্দিষ্ট বর্ণনা নেই কোথাও। এনিয়ে সাংবাদিক, সম্পাদক সকলেই একটা চরম ঝুঁকির মধ্যে। সর্বোপরি বাংলাদেশে কোন জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নেই। জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অভাব, সাংবাদিদের মধ্যে অনৈক্য, রাজনৈতিক বিভাজন, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন থামছে না। সাংবাদিক খুন বা নির্যাতিত হলে তার প্রতিকার মেলে না, বিচার হয় না। ফলে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনকারিরা উৎসাহিত হচ্ছে। সাংবাদিক সমাজ আমরা দেশে এযাবৎ সংঘটিত সকল সাংবাদিকসহ সকল হত্যা-নির্যাতনের বিচার চাই। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনসহ সকল হত্যা-নির্যাতনের প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে। যদি সমাজে সত্যিকারের আইনের শাসন, কার্যকর গণতন্ত্র থাকে। অত্যাচার-নির্যাতনের কোন প্রতিকার, বিচার, প্রতিবিধান নেই। এই যে একটা ধারণা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়েছে সেটাকে ভাঙা চাই। আর এটা করতে হলে চাই দেশপ্রেমিক জনঐক্য।
রাজনীতি, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের উর্দ্ধে ওঠে গণ জাগরণ গণবিপ্লব দরকার। গণবিপ্লবের মাধ্যমেই কেবল সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতরকার সমস্যাগুলোর সমাধান হতে পারে। সমাজ ও রাষ্ট্রে দায়মুক্তি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির শেকড় বেশ গভীরে। এটার প্রমাণ মেলে যখন আমরা দেখি, মানুষ হত্যাকান্ডের বিচার চান না। সহকর্মীর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর সাংবাদিক সমাজকে বলতে শুনেছি ’বিচার পাই না তাই বিচার চাই না’। এমন স্লোগান লিখে রাজপথে নামতে হয় সাংবাদিকদের। আমরা আশা করবো, এই অবস্থার পরিবর্তন হবে। আশার কথা হলো বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশে কমিউনিটি রেডিও নীতিমালা প্রণয়ন করে গেছে। মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট প্রণয়ন করেছে। এর মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি ধাপ এগিয়েছে বলে আমরা মনে করি। তবে এসব আইন প্রণয়ন করলেইতো আর হবে না। এগুলোকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে এবং কার্যকর করতে হবে।
বর্তমান সরকারের তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাসমূহ তুলে নেয়া হবে। ভাল কথা। রাজনৈতিক হয়রাণিমূলক মামলা তুলে নেয়াই উচিত। ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক হয়রাণিমূলক মামলা হয়েছে। আমি মনে করি, একটা বিষয় পরিস্কার হওয়া দরকার। সেটা হলো ধরুণ, একজন সাংবাদিক ’এক্স’। তিনি সত্যি সত্যি চাঁদাবাজি কিংবা অপরাধ করেছেন। তার মামলাও কী তবে তুলে নেয়া হবে? এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো-না সব মামলা তোলা উচিত হবে না। কেবলমাত্র যেসব মামলা রাজনৈতিব উদ্দেশ্য প্রণোদিত, মিথ্যা-হয়রাণিমূলক সেইসব মামলাই তুলে নেয়া হোক। অন্যথায় দেশে আইনের শাসন রক্ষা করা যাবে না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র আবার গণতন্ত্র ছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। কোনটাই ভাবা যায় না। সভ্য ও মানবিক কল্যাণমুখী সমাজে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটা পূর্বশর্ত। গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একে অপরের পরিপূরক। একটা ছাড়া অন্যটা অচল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের মাধ্যমে আজ (১০ জুলাই, ২০১০) কথা হলো আমার এক বন্ধু-সহকর্মীর সাথে। ফেইসবুক চেটিংকালে ওই বন্ধুটি জানালেন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ওপর তিনি চার পর্বের একটি সিরিজ প্রতিবেদন তৈরী করেন। যার অর্ধেক প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু অর্ধেকটা (দু’টি পর্ব)বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ সেনাবাহিনীর (র্যাব) চাপ। ২০০০ সালের ঠিক এই দিনে (১০ জুলাই) নিহত হয়েছিলেন বিখ্যাত সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবল। তিনি দৈনিক জনকণ্ঠের দক্ষিণালীয় প্রতিনিধি ছিলেন। নিজ অফিসে কর্মরত অবস্থায় তিনি সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান। এরপর দশটি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু খুনিদের বিচার হয়নি।
দৈনিক জনকণ্ঠ (১০ জুলাই, ২০১০) লিখেছে, ২০০১ সালে সিআইডি পুলিশ চাঞ্চল্যকর শামছুর রহমান হত্যা মামলায় ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে মামলার বর্ধিত তদন্ত করা হয়। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশে নিহত সাংবাদিক কেবলের বন্ধু সাংবাদিক ফারাজী আজমল হোসেনকে আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সরকার। আবার বাদ দেয়া হয় মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে। কিন্তু নতুন সাক্ষী করা হয় আসামিদের ঘনিষ্ঠজনদের। ২০০৫ সালের জুন মাসে এই মামলার সকল আসামির বিরুদ্ধে যশোরের ষ্পেশাল জজ আদালতে অভিযোগ গঠিত হয়। একই বছরের জুলাই মাসে বাদিকে না জানিয়ে মামলাটি খুলনার দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করে সরকার। মামলার অন্যতম আসামি খুলনার সন্ত্রাসী মুশফিকুর রহমান হিরক জামিন নিয়ে পলা
খুলনার আদালতে যাবার পর মামলার বাদি এ বং কয়েকজন সাক্ষীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হয়। সে সময় আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশে পুলিশ মামলার বাদি এবং সাক্ষীর বাড়িতে অভিযান চালায়। শহীদ শামছুর রহমানের স্ত্রী সেলিনা আকতার লাকি ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টে আপীল করেন। আপিলের আবেদনে বলা হয়, মামলার অন্যতম আসামি হিরক পলাতক রয়েছে। এই মামলার অন্যান্য আসামির সঙ্গে খুলনার সন্ত্রাসীদের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তাঁর পক্ষে খুলনায় গিয়ে সাক্ষ্য দেয়া সম্ভব নয়। এরই প্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি কেন যশোরে ফিরিয়ে দেয়া হবে তার জন্য সরকারের ওপর রুলনিশি জারি করে। বর্তমান মামলাটি সে অবস্থাতেই রয়েছে। মামলার এক আসামি খুলনার ওয়ার্ড কমিশনার আসাদুজ্জামান লিটু র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন। অপর আসামি কোটচাঁদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন কালু ২ বছর আগে স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করেন। অন্য আসামিরা জামিনে রয়েছে। কেবল ভাইয়ের মেয়ে সেজুঁতি ও প্রণতি চিরদিনের জন্য বাবার স্নেহ ও ভালবাসা থেকে বঞ্চিত। স্বামী হারানোর বেদনায় আজও কেঁদে ওঠেন লাকী ভাবি (কেবল ভাইয়ের স্ত্রী)। তিনি জানালেন প্রণতি বেড়ে উঠছে তার ‘ছবি বাবা’কে (কেবল ভাইয়ের ছবি দেখে)দেখে।
বাংলাদেশে ন্যায় বিচার, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এই বেহাল অবস্থা। অথচ গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি, রাজনৈতিক দুর্বত্তায়ন বাংলাদেশের গোটা সমাজ ব্যবস্থার উপরই চরম এক আঘাত। প্রকৃত এবং বাস্তবিক অর্থেই গণতন্ত্রের চর্চা ছাড়া এই অবস্থা থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই। দুর্নীতি, অশিক্ষা আর দারিদ্রতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারলেই কেবল গণতন্ত্রের পথ মসৃণ হতে পারে। সেই পথ দেখানোর দায়িত্বটা কিন্তু রাজনীতিবিদদেরই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সকল সাংবাদিক, রাজনৈতিক হত্যা-নির্যাতনের বিচার চাই আমরা। আইনমাফিক সকল ধরণের প্রভাবমুক্ত ন্যায্য বিচার।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিএনপি-জামায়াত আমলে ১৪ সাংবাদিক হত্যাকান্ডের তথ্য তুলে ধরেন। এই তথ্য যেমন সত্য তেমনি মহাজোট সরকারের আমলে ৫ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, এটাও সত্য। কিন্তু তিনি (প্রধানমন্ত্রী) অর্ধাংশ স্বীকার করে অর্ধেকটা অস্বীকার করেছেন পরোক্ষভাবে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে জনপ্রিয় একুশে টেলিভিশন বন্ধ করা হয়েছিল। এটা যেমন সত্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে চ্যানেল ওয়ান, যমুনা টিভি ও আমার দেশ বন্ধ হলো। উভয়ই সত্য। আমরা অর্ধসত্য নয় পুরো সত্য জানতে চাই। বাংলাদেশের অর্ধসত্য রাজনৈতিক অবস্থান পুরো সত্যের জায়গায় আসতে পারবে কী?
লিংক
বাস্তব জীবনে এটার সত্যতা অনুবাধন করলাম এই প্রবাসে এসে। ব্যতিক্রম যে নেই তা বলতে পারি না। এক্ষেত্রে জীবন্ত উদাহরণ দিতে পারি আবদুল্লাহ আল-হারুণের। যিনি তিন দশক যাবত জার্মানে বসবাস করছেন। তার মত মানুষদেরকে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়। কী দুর্ভাগ্য আমাদের! অথচ যিনি বাংলাদেশকে অনেক কিছু দিতে পারতেন। যা থেকে বাঙালি সমাজ বঞ্চিত হলো। তিনি যদি বাংলাদেশে থাকতেন? হয়ত আজ জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন কিংবা হুমায়ূন আহমেদকে ছাড়িয়ে যেতেন! কিংবা খ্যাতিমান প্রয়াত নাট্যকার আবদুল্লাহ আল-মামুনের খ্যাতিকেও ছাপিয়ে যেতে পারতেন তার কর্মগুণে। আবদুল্লাহ আল-হারুণ অবশ্য তারই অনুজ সহোদর। আবার কেউ যদি রাষ্ট্রীয় বাহিনী কিংবা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী অংশের অপছন্দের হন। অথবা যিনি ডান পক্ষেও নেই আবার বামপক্ষেরও নন। বাঙালি হিসেবে তার মত অভাগা বোধহয় এজগতে আর কেউ নেই। বাংলাদেশের মত সমাজে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না থাকলে টিকে থাকা খুবই কঠিন। সম্প্রতি বার্লিনে আমাকে এই সত্যটা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের এক সুহৃদ।
যাহোক, আজকের লেখার প্রসঙ্গ এটা নয়। লেখক আবদুল্লাহ আল-হারুণ প্রবাস জীবনে আমার একজন বড় বন্ধু, অভিভাবক। তার সাথে আমার বয়সের দিক ধরলে বলতে হবে পিতা-পুত্রের মত সম্পর্ক। তার মাধ্যমেই কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক শওগাত আলী সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে আমার। তিনি অনলাইন সংবাদপত্র নতুন দেশ এর প্রকাশক এবং তার স্ত্রী সেরিন ফেরদৌস সম্পাদক। উভয়ই পেশাদার সাংবাদিক। বাংলাদেশে থাকতে কারও সঙ্গেই আমার সরাসরি যোগাযোগ হয়নি কোনদিন। কিন্তু উভয়ের রিপোর্টই আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করতো। তাদের রিপোর্টের সঙ্গে ছিল আমার এক ধরণের গভীর সম্পর্ক। নতুন দেশে প্রকাশিত আবদুল্লাহ আল হারুণের একটি লেখা সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করি। এটা করতে গিয়ে শওগাত ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ই-মেইল যোগাযোগের মাধ্যমে। খুব বেশিদিনের কথা নয় এটি। মার্চের ১০ কিংবা ১২ তারিখে (২০১০) প্রথম যোগাযোগ সাগর ভাইয়ের সঙ্গে। নতুন দেশ পত্রিকার প্রথম বর্ষ সংখ্যা ৩৮, ২১ এপ্রিল, ২০১০ সংখ্যায় একটি লেখা ছাপা হয় জনৈক আবুর রহিম মজুমদারের নামে। শিরোনাম ছিল বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন।
ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন সংক্রান্ত যেকোন ধরণের রিপোর্ট বা লেখার প্রতি আমার আগ্রহ একটু বেশি। তাই লেখাটি মনোযোগ আকর্ষণ করে আমার। কিন্তু প্রথম প্যারা পড়ার পরই লেখার সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক মনে হতে লাগলো। এবং লেখাটি পুরো একবার পড়ার পরই বুঝতে পারি এটা আমার লেখা। হুবহু আমার এই লেখাটিই ভিন্ন শিরোনামে ছাপা হয় বাংলাদেশের প্রাচীন সংবাদপত্র দৈনিক সংবাদে। সেই আমার লেখাটি ছাপানো হয় নতুন দেশে। ২০০৯ সালের ১৬ জুলাই দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার লেখাটির শিরোনাম ছিল ”সাহসী সাংবাদিক শামছুর রহমান হত্যা দিবস এবং বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন”। দ্রুত একটা ই-মেইল পাঠালাম সাগর ভাইকে। তিনি স্বস্তিমূলক একটা উত্তর দিলেন তড়িৎ বেগে। তারপরেই দেখা গেলো লেখাটি ডিলিট করে দেয়া হয়েছে। আমি যদি কারও লেখা হুবহু নকল করে নিজের নামে কোথাও পাঠাই। তবে কোন সম্পাদক-বার্তা সম্পাদক বা প্রকাশকের পক্ষেই তা আঁচ করা সম্ভব নয়। নকল বা চুরির বিষয়টি তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষপে নিশ্চিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। যেটা বাস্তবে করে দেখালেন প্রিয় শওগাত ভাই ও সেরিন আপা। পেশাদারি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এটা একটা নজির। ধন্যবাদ নতুন দেশ কর্তৃপক্ষকে। নতুন দেশ পরিবারের সাথে একটা গভীর আত্মিক সম্পর্ক অনুভব করি আমি। আশা করি এই সম্পর্কের ধারা বহমান রইবে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল ও প্রিয় পাঠকদের কাছে বাংলাদেশের প্রেসফ্রিডমের একটা চিত্র তুলে ধরতে চাই। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে মাত্র। তখন আমি কলেজে পড়ি। শিক্ষানবিশ রিপোর্টার হিসেবে দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে কাজ করি দৈনিক বাংলায়। তখনই দৈনিক বাংলা কার্যালয়ে পরিচয় দু:সাহসী দেশপেমিক সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় শামছুর রহমান কেবলের সঙ্গে। ১৬ জুলাই তাঁর হত্যাবার্ষিকী। ২০০০ সালের এই দিনে দুর্বৃত্তরা তাঁকে হত্যা করে বুলেটের আঘাতে। তখন তিনি দৈনিক জনকণ্ঠে কাজ করেন যশোর থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন করার লক্ষ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এরপর দৈনিক বাংলা ছেড়ে যোগ দিই দৈনিক সংবাদে। তখন পরিচয় হয় সাংবাদিক মানিক সাহার সঙ্গে। খুলনা থেকে তিনি সাংবাদিকতা করতেন। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভয়াবহ সন্ত্রাস, তান্ডব দেশবাসিকে ভাবিয়ে তুলতো। এই অপশক্তি আমাকে বারবার হত্যার হুমকি দেয়। মানিক সাহা বলতেন, ”আকাশ বেশি রিস্ক নিও না। সাবধানে থেকো। ওরা (শিবির) খুব ভয়ংকর।” এই অকুতোভয় জনদরদী সাংবাদিক আর নেই আমাদের মাঝে। বোমার আঘাতে এই দেশপ্রেদিকের মাথার খুলি উড়িয়ে দিয়েছিল দুর্বৃত্তচক্র। আজও জ্বল জ্বল করে ভেসে ওঠে মানিক সাহার সেই রক্তাক্ত ছবিটা। তার মাথার মগজ সেদিন উড়ে গিয়েছিল বোমার আঘাতে। রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল তার দেহটা। রাস্তার ওপরে নিথর হয়ে পড়ে থাকা দেহ যেন গোটা বাংলাদেশ। পর্শিয়া ও নাতাশাতো আর কোনদিন বাবা ডাকতে পারবে না। মানিক সাহার দুই কন্যা। নন্দা বউদির চোখের জল মুছে গেছে। কিন্তু হৃদয়ের যে ক্ষরণ তা কী কোনদিন বন্ধ হবে?
মুক্ত গণমাধ্যমতো পরের কথা সাংবাদিকদের জীবনেরই কোন নিশ্চয়তা নেই। সন্ত্রাস, রাজনীতি ও সমাজনীতির সব তথ্যের জীবন্ত ভান্ডার ছিলেন কেবল ভাই। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জীবনে দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘুরে নতুন বছর আসে। কিন্তু সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের বিচার হয় না। দেশে ”সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক” নামধারী একটা নির্বাচিত সরকার আছে। এটা আবার মহাজোট সরকার নামে বেশি পরিচিত। কিন্তু সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন বন্ধ হয়নি। বন্ধ করা যায়নি বিনা বিচারে মানুষ হত্যা। মাত্র ক’দিন আগে চলে গেলো ফরিদপুরের সাংবাদিক গৌতম দাসের হত্যা দিবস। আদালতে আত্মসমর্পণকারি একজন অভিযুক্ত খুনি (গৌতম হত্যার) কী করে পালিয়ে যায়? এটা আমাদের জানা নেই। তবে দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার আছে বলে মনে হয় না। থাকলে অন্তত সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন বন্ধ হতো। বিচার পেতো নির্যাতিত ও নিহত সাংবাদিক পরিবারগুলো।
গণতন্ত্র ছাড়া গণমাধ্যম স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। মানবাধিকারও থাকে না। অসাম্য আর অন্যায্যের পৃথিবীতে সাংবাদিকতা দিন দিন ঝঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ও অশান্ত দুনিয়ায় সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন নতুন কোন বিষয় নয়। তাইতো বিশ্বময় প্রেসের স্বাধীনতা তথা প্রেস ফ্রিডম বা মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য আওয়াজ তীব্র হচ্ছে ক্রমশ:। এই আওয়াজ গণমাধ্যমের গন্ডি পেরিয়ে নাগরিক সমাজের বৃহৎ অংশকেও টানতে সক্ষম হয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র অসহায়। গণমাধ্যম ও গণতন্ত্র একে অপরের পরিপুরক। বিশ্বে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকতার ঝুঁকিটা চরমে পৌঁছেছে। আর বাংলাদেশেতো প্রায় প্রতিনিয়ত সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম রাষ্ট্রযন্ত্রের খবরদারি, নিপীড়নের মধ্যেই আছে।
জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে রক্ষা করা গণমাধ্যমের প্রধান কাজ। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। অধিকারহারা শোষিত বঞ্চিত অসহায় মানুষদের পক্ষে গণমাধ্যম সর্বদা সোচ্চার। সমাজপতি, রাষ্ট্রনায়কদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার মহান দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে গণমাধ্যম। সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে সাংবাদিকরা শত প্রতিকুলতার মধ্যেও কাজ করছেন। বাংলাদেশে তিন’টি জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে। দুর্নীতি, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা লুটপাট নিয়ে খবর বেরুলেই হলো। সাংবাদিক আর যায় কোথায়? সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের খবর হয়ে যাবে। একই কারণে সাংবাদিককে মন্ত্রি-এমপিদের অথবা রাজনৈতিক প্রভাবশালি মহলের খপ্পড়ে পড়তে হবে। গণমাধ্যমকর্মীদের, প্রভাবশালিদের রোষানলে পড়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। হত্যা-নির্যাতন, হয়রাণি, গ্রেফতার, মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে বন্ধুর করে তুলেছে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকদের জন্য জীবন খুব বিপদজনক। কারণ সাংবাদিকরা মানুষের কথা বলেন। মানুষের বিপদ হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করে গণমাধ্যম। রাজনৈতিক দূুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি-দু:শাসনের কথা তুলে ধরেন সাংবাদিকরা। ফলে সাংবাদিকদের উপরেই সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের কষাঘাত এসে পড়ে। যেসমস্ত সাংবাদিক বা মিডিয়া মানুষের নিগ্রহের বিরুদ্ধে কথা বলতে চেষ্টা করেন। কিংবা যারা মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেন তাদের উপরেই সবচেয়ে বেশি অত্যাচার নেমে আসে। এখানে আমরা উদাহরণ দিতে পারি একুশে টেলিভিশন (বন্ধ হবার আগেকার একুশে টিভির কথা বলা হচ্ছে) এবং সিএসবি নিউজ এর। একুশে টিভি এবং সিএসবি নিউজ এই দু’টি টিভি চ্যানেল ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন ছল-ছুতোয় সরকার এই বৃহৎ দু’টি টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও আদালতের রায়ের মাধ্যমে পরে একুশে টেলিভিশন পুনরায় চালু হয়েছে। বাংলাদেশে প্রেসফ্রিডম এর আরও খবর হলো আরেকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার টেলিযোগাযোগ আইন লংঘন’র অভিযোগে চ্যানেল ওয়ান এর সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় ২৭ এপ্রিল, ২০১০ সন্ধ্যায়। (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ২৮ এপ্রিল, ২০১০)। একই দিনের সংবাদ’ এর দেশ পাতায় আরেকটি খবরের শিরোনাম হলো ”মানিকগঞ্জ সংবাদ প্রতিনিধিকে পৌর মেয়রের প্রাণনাশের হুমকি: থানায় জিডি”।
রিপোর্টের ভাষ্য মতে, দুর্নীতি বিষয়ক একটি অভিযোগের বিষয়ে মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা রমজান আলীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন সাংবাদিক মুহম্মদ আবুল কালাম বিশ্বাস। এসময় মেয়র সাংবাদিককে বলেন, ”তুই যদি আর পত্রিকায় আমার ও আমার পরিবার নিয়ে কোন সংবাদ প্রকাশ করিস তবে তোকে প্রাণে মেরে ফেলা হবে। আগেও তুই আমার ভাইকে নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করেছিস। আমি তখন আমার লোকজন নিয়ে তোকে খুঁজেছি, কিন্তু তোকে পাইনি। তাই তুই প্রাণে বেঁচে গেছিস। পত্রিকায় আর যদি কোন সংবাদ আমাকে নিয়ে লিখিস, তাহলে আমি তোর ও তোর পরিবারের ক্ষতি করবো।”
বাংলাদেশে প্রেসফ্রিডমের সর্বষে খবর হলো-দৈনিক আমার দেশ এর প্রকাশনা বন্ধ। ১ জুন, ২০১০ সরকার এক ঠুনকো অজুহাতে বিরোধী শিবিরের সমর্থক এই পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। একই রাতে সরকার আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে (যদিও তিনি পেশাদার কোন সাংবাদিক নন, তবে বাংলাদেশে বহু অপেশাদার মানুষ মিডিয়া অঙ্গনের নামকরা ব্যক্তিত্ব) গ্রেফতার করে। বাংলাদেশের প্রাচীন ইংরেজী দৈনিক অবজারভার বন্ধ হয়ে গেছে জুন (২০১০) মাসেই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস ও সাপ্তাহিক বিচিত্রা বন্ধ করে দেয়। আওয়ামী লীরে নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারই ২০০৯ সালের ১৫ অক্টোবর পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু করে। কিন্তু কথিত অনিয়মের অভিযোগে ১৯ নভেম্বর, ২০০০৯ সরকার যমুনা টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়।
বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের শেষ নেই। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন যেন এক মামুলি ব্যাপার সেখানে। ময়মনসিংহের গফরগাঁয়ে দৈনিক সমকালের বিপ্লবের হাত-পা ভেঙ্গে দেয়া হয় জোট সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই। অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য সরকার দলীয় একজন সংসদ সদস্যের প্রত্যক্ষ মদদে এ ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ। সেই ঘটনার সর্বশেষ কী অবস্থা তা আমরা আজও জানি না। ঢাকার উত্তরায় কমিউনিটি বেইসড একটি পত্রিকার তরুণ রিপোর্টার নূরুল ইসলাম রানা খুন হয়েছেন। এটা ২০০৯ সালের ৩ জুলাইয়ের ঘঁনা। বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলই ৫ সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। নিহত সাংবাদিকরা হলেন ফতেহ ওসমানী, শফিকুল ইসলাম মিঠু, আবদুল হান্নান, আহসান বারী ও নূরুল রানা। আর জরুরি অবস্থায় এই লেখক (জাহাঙ্গীর আলম আকাশ) ছাড়াও দ্য ডেইলি স্টারের তাসনীম খলিল নির্যাতিত হন সেনাবাহিনী ও র্যাবের হাতে। জরুরি অবস্থা চলাকালে সিলেট, বান্দরবান, নীলফামারীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিদের বিরুদ্ধে হয়রাণিমূলক মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর সামরিক শাসন দেশের মানুষের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে। বহু লড়াই-সংগ্রাম আর আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। মুক্তি পায় গণতন্ত্রের পায়রা। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মানুষ ফিরে পায় স্বাধীনতার পুন:স্বাদ। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্টিত হয় জেনারেল জিয়াউর রহমানের গড়া দল বিএনপি। ক্ষমতায় এসেই বিএনপি সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। সরকারি মালিকানাধীন সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থা, গণমাধ্যম থেকে বিএনপির কাছে ‘অপছন্দনীয়’ সাংবাদিকরা গণছাঁটায়ের শিকার হন। কোন রকমের টার্মিনেশন বেনিফিট ছাড়াই বিএনপি সরকার ছাঁটাই করে দৈনিক বাংলার তৎকালীন সম্পাদক তোয়াব খান, তৎকালীন সাপ্তাহিক বিচিত্রার নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার কবিরসহ ১৪ জন সিনিয়র সাংবাদিককে।
২০০২ সালের নভেম্বর মাসের কথা। বিবিসি চ্যানেল ফোরের জন্য একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন বিদেশী সাংবাদিক জাইবা মালিক ও ব্রুনো সরেনটিনো। এই ’অপরাধে’ বিএনপি সরকার সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন করে। ব্রিটিশ ও ইতালীয় এই দুই সাংবাদিকসহ বাংলাদেশের শাহরিয়ার কবির, সালিম সামাদ ও পিসিলা রাজকে গ্রেফতার করা হয়। ময়মনসিংহের সিনেমা হলে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এর সাথে জড়িত করে গ্রেফতার করা হয় বাসস’র সাংবাদিক এনামুল হক চৌধুরী ও বিশিষ্ট কলামিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুনকে। আটকাবস্থায় বিএনপি সরকার সাংবাদিকদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়েছিল বলে অভিযোগ।
২০০৯ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকের ঘটনা। দৈনিক সংবাদের ধামরাই প্রতিনিধি শামীম পারভেজ খানকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় দুর্বৃত্তরা। এলাকার নিরীহ লোকদের বিভিন্ন মিথ্যা মামলা থেকে বাঁচতে সহায়তা করার করেন এই সাংবাদিক। এতেই ক্ষুব্ধ হয় স্বার্থান্বেষী মহল। হুমকির বিষয়ে থানায় জিডি হলেও সন্ত্রাসীরা গ্রেফতার হয়নি। একই মাসের শুরুর দিকে ঘটে আরেক ঘটনা ময়মনসিংহে। গফরগাঁওয়ে দৈনিক সমকাল প্রতিনিধি শামীম আল আমিন বিপ্লবের ওপর আক্রমণ করা হয়। সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমদ এর ক্যাডার বাহিনী বিপ্লবের হাত-পা ভেঙ্গে দেয়। ২২ অক্টোবর (২০০৯) বাড়ির ভেতরে বর্বর নির্যাতনের শিকার হন সাংবাদিক এফ এম মাসুম। র্যাব সদস্যরা তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে। তিনি নিউ এজ পত্রিকার রিপোর্টার। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিষয়ে রিপোর্ট করেছিলেন। যার কারণে তাকে নির্যাতিত হতে হয়।
২০০৬ সালের ১৬ এপ্রিল মাস। চট্রগ্রামে বাংলাদেশ ও অষ্ট্রেলিয়ার মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল। খেলার মাঠের তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ চালায় নির্মমতা। পুলিশ বাহিনী সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। পুলিশের তৎকালীন ডিসি আলী আকবরের নেতৃত্বে অন্ত:ত ৩০ জন সাংবাদিক আহত হন। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায় নিযুক্ত প্রবীণ আলহাজ্ব জহিরুল হক। তাকেও সেদিন পুলিশ যেভাবে আক্রমণ করেছিল তা কোন সভ্য সমাজে ভাবাই যায় না। পুলিশ রাইফেলের বাঁট দিয়ে সাংবাদিকদের পিটিয়েছে। সাংবাদিক সমাজের আন্দোলন তুঙ্গে এই ঘটনার প্রতিবাদে। তখন তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ঘটনা তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করেছিল। সেই রিপোর্ট আজও আলোর মুখ দেখেনি। হামলাকারী পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্যান্যরা কেউই শাস্তি পাননি আজও।
২০০৬ সালের ২৯ মে। কুষ্টিয়ায় তৎকালীন সরকার দলীয় সেখানকার সংসদ সদস্য সাংবাদিকদের ওপর লেলিয়ে দেয় সন্ত্রাসী। সেই ক্যাডার বাহিনী হামলা করে সাংবাদিকদের সমাবেশে। নির্যাতনবিরোধী ওই সমাবেশে হামলায় গুরুতর আহত হন বিশিষ্ট সাংবাদিক বাংলাদেশ অবজারভার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। আমাদের স্মৃতিতে আজও সেই রক্তাক্ত ইকবাল সোবহান চৌধুরীর ছবি ভেসে ওঠে। সন্ত্রাসী ক্যাডারদের কোন শাস্তি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।
সাংবাদিকতাই আমার পেশা এবং নেশা। সার্বক্ষণিক ধ্যাণ, চিন্তা-চেতনার মধ্যেই আছে আমার সাংবাদিকতা। মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা। জনকল্যাণ ভাবনা। মানুষের ওপর যে অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার। এসব নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই হলো আমার জীবনের জন্য কাল। নন পার্টিজানশিপ সাংবাদিকতা করার এবং সর্বদাই ইনভেষ্টিগেটিভ জার্নালিজম করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি কখনই ভাবতে পারি না নির্যাতিত হবো নিজেই। কল্পনাও করিনি কোনদিন এমনটা। অন্যায়-অবিচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে নিজেই রাষ্ট্রীয় বর্বরতার শিকার হলাম।
অন্যায়-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমি রিপোর্ট করেছি। সেইরকম নির্যাতনই আমার জীবনটাকে পাল্টে দেবে? এটা ভাবনায় ছিল না আমার। আজকে আমি একটা কঠিন বাস্তবতা কিংবা সত্যের মুখোমুখি। এক ধরনের একটা অনিশ্চয়তা একটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে আমার জীবনটাকে। আমি জানি না এ অবস্থার অবসান হবে কিনা? কারণ আমরা একটা অসভ্য-বর্বর সমাজের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। একটা অপশক্তি এই সমাজকে সবসময় অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে চায়। যে অপশক্তি দিন দিন সমাজকে আবৃত করে ফেলছে। আমরা জানি, শত হয়রাণি, নির্যাতন ও হুমকিতেও জনজোয়ারের ঢেউ আটকানো যায় না। তেমনি কোন কোন মানুষকে আদর্শচ্যুত করা যায় না। অত্যাচার, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও অপশক্তি কখনই সত্যকে নিভিয়ে দিতে পারে না। তেমনি বাংলাদেশের সত্যান্বেষী কলম সৈনিকদেরর দমানো যাবে না হত্যা-নির্যাতন করে।
বাংলাদেশের যে বাস্তবতা তাতে আমাদের বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেই নির্যাতন জড়িয়ে আছে। অত্যাচার বা নিপীড়ন বিষয়টা শক্তভাবে গ্রোথিত। মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই (ব্যতিক্রম ছাড়া) নিয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্রসফায়ারের মত মানব হত্যার জঘন্য ঘটনাকে। পুলিশ, র্যাব বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হেফাজতে হত্যা-নির্যাতন একটা সাধারণ ব্যাপার। নির্যাতনের প্রেক্ষিতে মৃত্যুর পরও সমাজ কোন উচ্চবাচ্চ করে না। সরকার সবসময় এসব অপকর্মকে বৈধতা দিয়ে আসছে। অন্যকথায় দায়মুক্তি দিচ্ছে। নির্যাতনকারি-খুনির দল হচ্ছে পুরস্কৃত। এখানে মিডিয়ার ভূমিকাও প্রশ্নবোধক। মিডিয়া তোতাপাখির ন্যায় ক্রসফায়ার বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের পক্ষ নিচ্ছে। মিডিয়া বাধ্য হয়ে করুক আর স্বেচ্ছায় করুক এটা দেখছি আমরা। ক্রসফায়ারকারিদের প্রেসবিজ্ঞপ্তিটি ছেপে দিতে কার্পণ্য করে না আমাদের গণমাধ্যম। অবশ্য যারা সাহস নিয়ে দু’একটি রিপোর্ট করেন তারা পড়েন চরম বেকায়দায়। তাদের হয় নির্যাতিত না হয় চাকুরিচ্যুত হতে হয়।
জাতির বিবেক, জাতিকে যারা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন তারাই হলেন সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মী। সেই সাংবাদিকদের উপরে র্যাবের নির্যাতন চরমে এসে পৌঁছায় জরুরি অবস্থার সময়ে। তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমি নিজেই। আর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের উদাহরণ অনেক আছে। আমাদেরই সাহসী সাংবাদিক বিশিষ্ট কলামিষ্ট মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব শাহরিয়ার কবির স্বয়ং এক বড় উদাহরণ। শাহরিয়ার কবিরের ওপর বর্বর রাষ্টীয় নির্যাতন হয়েছে। আজও তিনি তার শরীরে সেই ক্ষতচিহ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একই অবস্থা এই লেখক এবং নিউ এজ এর মাসুমের। কিন্তু তারপরও আমরা চাই, আর কেউ যেন নির্যাতনের মাধ্যমে কিংবা বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার না হয়। দেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের কিঞ্চিৎ খতিয়ান তুলে ধরা যাক এবার। মানিক সাহা ছিলেন খ্যাতিমান সাংবাদিক। তিনি দৈনিক সংবাদ, নিউ এজ, বিবিসি ও বন্ধ হয়ে যাওয়া একুশে টেলিভিশন এর প্রতিনিধি ছিলেন। সন্ত্রাসীরা তার পর বর্বর ও নৃশংস বোমা হামলা চালায় ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে। ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন খুলনা প্রেসক্লাবের অনতিদূরে। এমন নৃশংস কায়দায় সাংবাদিক হত্যার নজির নেই আমাদের দেশে। মানিক সাহা হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশ জুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই হত্যাকান্ডের প্রকৃত খুনিরা আজও ধরাছোয়ার বাইরে।
২০০৪ সালের ২ মার্চ দি নিউ এজ পত্রিকার খন্ডকালীন সাংবাদিক কেরানীগঞ্জের আবদুল লতিফ নাবিলকে জবাই করে হত্যা করা হয়। স্ত্রী ফারহানা সুলতানা কনকের পরকীয়া প্রেমে বাধা দেয়ার কারণে এই হত্যাকান্ড ঘটে বলে অভিযোগ। স্ত্রীর প্রেমিক নির্জন মোস্তাকিন, মোস্তাকিনের বন্ধু শহিদুল ইসলাম পাপ্পু ও নাবিলের স্ত্রী কনক মিলে নাবিলকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরবর্তীতে মোস্তাকিন, পাপ্পু ও স্ত্রী কনককে পুলিশ গ্রেপ্তার করলে মামলার কী অবস্থা? এটা আমাদের জানা নেই। দৈনিক জন্মভূমি সম্পাদক ও খুলনা প্রেসক্লাব সভাপতি ছিলেন হুমায়ূন কবির বালু। ২০০৪ সালের ২৭ জুন খুলনায় সন্ত্রাসীরা বোমা মেরে হত্যা করে তাকে। একই সালের ২১ আগস্ট রাতে সন্ত্রাসীরা কামাল হোসেনকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে জবাই করে হত্যা করে। তিনি ছিলেন খাগড়াছড়ির মানিকছড়ির আজকের কাগজ প্রতিনিধি ও উপজেলা ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক।
বগুড়ার দূর্জয় বাংলার নির্বাহী সম্পাদক ও বিএফইউজে সহ-সভাপতি দীপংকর চক্রবর্তী (৫৯)। তাকে একই বছরের ২ অক্টোবর হত্যা করা হয়। শেরপুরের সান্যালপাড়ার নিজ বাড়ির পাশেই সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এই সৎ সাংবাদিককে। ঢাকার কাঁটাবনে ২০০৪ সালের ২৪ অক্টোবর নিহত হন আরেক সাংবাদিক। দৈনিক এশিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা অফিসে ঢুকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে শহীদ আনোয়ার অ্যাপোলো (৩৫) কে। অ্যাপোলো ওই পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক বলে তার পকেট থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকান্ড ঘটে থাকতে পারে বলে জানা গেছে। ২০০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি খুলনা প্রেসক্লাবে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে দৈনিক সংগ্রাম’র খুলনা ব্যুরো প্রধান শেখ বেলালউদ্দিনকে নিহত ও আরও ৪ সাংবাদিক আহত হন। একই বছরের ২৯ মে দিবাগত মধ্য রাতে কুমিল্লায় দৈনিক কুমিল্লা মুক্তকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মুহাম্মদ গোলাম মাহফুজ (৩৮) নিহত হন। তাকে জবাই করে হত্যা করে সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তরা।
সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হয়েছেন ফরিদপুরে সমকালের প্রতিনিধি গৌতম দাস, যশোরে দৈনিক রানারের গোলাম মাজেদ, খুলনায় হারুন-অর রশিদ খোকন, দৈনিক জন্মভূমির হুমায়ুন কবির বালু, দৈনিক সংবাদের মানিক সাহা, রাঙ্গামাটির জামালউদ্দিন, ঝিনাইদহের মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপ, দৈনিক সংগ্রামের শেখ বেলালউদ্দিন, নহর আলী, শুকুর আলী হোসেন, নারায়ণগঞ্জের আহসান আলী, মৌলভীবাজারের ফারুক আহমেদ, নীলফামারীর নীলসাগরের মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, সাতক্ষীরার শ.ম.আলাউদ্দিন, যশোরের দৈনিক জনকণ্ঠের শামছুর রহমান কেবল, সাইফুল আলম মুকুল। সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকারকর্মীদের ওপর নির্যাতনের একটি ঘটনায়ও নির্যাতনকারির শাস্তি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। জোট আমলে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে বিশিষ্ট কলামিষ্ট অধ্যাপক মুনতাসির মামুন, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, এনামুল হক চৌধুরী সালিম সামাদ রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জোট আমলে নির্যাতিত হয়েছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, আলহাজ্ব জহিরুল হক। নির্যাতিত হয়েছেন সাংবাদিক প্রবীর শিকদার, টিপু সুলতান।
বিগত ১৭ বছরে বাংলাদেশে প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক ডক্টর হুমায়ূন আজাদসহ ৩১ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। ২০০৯ সালের ৩ জুলাই সাংবাদিক নূরুল ইসলাম রানা সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন ঢাকার উত্তরায়। বর্তমান সরকারের আমলে নিহত হয়েছেন সাংবাদিক আবদুল হান্নান (ডেমরা, ঢাকা) ও এম এম আহসান বারী (গাজীপুর, ঢাকা)। বেসরকারি সংগঠন অধিকারের রিপোর্ট মতে, ২০০৯ সালে দেশে ৩ জন সাংবাদিক নিহত, ৮৪ জন আহত, ৪৫ জন লাঞ্ছিত, ১৬ জন আক্রান্ত, একজন গ্রেফতার, দুইজন অপহরণ, ৭৩ জন হুমকির শিকার, ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা, ১৯ জন অন্যান্য ঘটনায় আক্রান্ত হন। ৪১ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে ৩৮ জন সাংবাদিক আহত, ২৬ জন হুমকির শিকার, ১৭ জন লাঞ্ছিত, একটি সংবাদপত্র কার্যালয় ও ৮ জন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলে তৎকালিন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী সাংবাদিক পিটিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনায় ওঠে আসেন। বার্তা সংস্থা ইউএনবির তৎকালিন ফেনী প্রতিনিধি টিপু সুলতানের ওপর হাজারীর ক্লাস কমিটির সদস্যরা হামলা করে। তখন তৎকালিন প্রধানমন্ত্রি (যিনি বর্তমানেও প্রধানমন্ত্রি) শেখ হাসিনা পরোক্ষভাবে সাংবাদিক নির্যাতনকারির পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, টিপু সুলতানের কী কোন এক্রিডিটেশন কার্ড আছে? ওটা ছাড়া কী সাংবাদিক হওয়া যায় নাকি? অথচ বাংলাদেশের শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ সাংবাদিকের কোন এক্রিডিটেশন কার্ড নেই। যদিও এই কার্ড দেয়া নিয়েও রয়েছে নানান কথা। সে প্রসঙ্গ থাক আজ।
দেশে আলোচিত সাংবাদিক হত্যাকান্ডগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও বহুল আলোচিত হলো মানিক সাহা, শামছুর রহমান কেবল, হুমায়ুন কবির বালু, দীপংকর চক্রবর্তী, গৌতম দাস, হারুন রশিদ খোকন, সাইফুল আলম মুকুল, শেখ বেলালউদ্দিন। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বহু সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। এরমধ্যে দৈনিক জনকণ্ঠের সম্পাদক প্রকাশক মুক্তিযোদ্ধা আতিকউল্লাহ খান মাসুদ, জাহাঙ্গীর আলম আকাশ, তাসনীম খলিল, কার্টুনিষ্ট আরিফুর রহমান প্রমূখ উল্লেখযোগ্য। তত্ত্বাবধায়ক আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের তুচ্ছ ঘটনা ঘটে। এরই জের ধরে সেনাবাহিনী দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ছাত্রদের ওপর নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল প্রগতিশীল শিক্ষক-শিক্ষার্থী মৌন মিছিল করেন। এই অজুহাতে তৎকালিন সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নামে রাজনৈতিক হয়রাণিমূলক মামলা চাপিয়ে দেয়।
প্রথাবিরোধী বিশিষ্ট নাট্যকার-অভিনেতা, কলামিষ্ট মলয় ভৌমিক। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করেছেন। এখন নিয়মিত কলাম লিখেন দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলো, যুগান্তরসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে। তার ”উত্তরের উলুখাগড়া” শীর্ষক কলাম দৈনিক সংবাদ এর জনপ্রিয় কলাম ছিল। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বয়সী নাট্য সংগঠন অনুশীলন নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও সঙ্গীত বিভাগের চেয়ারম্যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের মত শায়ত্বশাসিত একটি ক্যাম্পাসে নির্যাতনবিরোধী মৌন র্যালি করার অপরাধে বর্বর নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন তিনি। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হয়নি।
সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনাগুলো নতুন নয়। জরুরি অবস্থার সময় সাংবাদিকদের আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। সাংবাদিকদের যেভাবে পর্যুদস্ত করা হয়েছে তার প্রতিকার সাংবাদিক সমাজ কার্যকরভাবে চাইতে পেরেছে কিনা? সেটাও আজকে একটা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। সাংবাদিকদের বিভাজন, সাংবাদিকতা পেশার রাজনীতিকরণ, সুশাসনের অভাব, কার্যকর গণতন্ত্রহীনতা, সুবিধাবাদিতা, বৈষম্য, ধনিক পুঁজি অভিমুখী গণমাধ্যমসহ নানা কারণে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের কোন প্রতিকার হয়নি আজও।
সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের প্রতিকার না পাবার পেছনে আরেকটি শক্তিশালী কারণ বিদ্যমান। সেটা হলো-দলীয় সাংবাদিকতা। আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের আমলে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন হলে আওয়ামী তথা মহাজোট সমর্থক সাংবাদিকরা নিরব হয়ে যান। বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে যারা সোচ্চার থাকেন রাজপথে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের প্রতিবাদে। অন্যদিকে আবার বিএনপি-জামায়াত আমলে শত সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন হলেও বিএনপি-জামায়াতপন্থি সাংবাদিক সমাজ মুখে কুলুপ আটে। যারা মহাজোটের আমলে মহাবিপ্লবী সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে।
সাংবাদিক কিংবা সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট। যেকোন হেফাজতে কোন নাগরিককে নির্যাতন সভ্য সমাজে চলতে পারে না। সাধারণ নাগরিক হোক অথবা রাজনীতিবিদ হোক কিংবা পেশাজীবি হোন বা গণমাধ্যমকর্মী হোন কারও কোন নির্যাতনের ঘটনা যেন আর না ঘটে। সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে এটা আমাদের দাবি। যদি এই ধরনের কোন ঘটনা ঘটে তার সুষ্ঠু তদন্ত করা প্রয়োজন। যারা এমন নির্যাতনের সাথে জড়িত থাকবে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় আনতে হবে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সংঘটিত সকল সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনার কার্যকর তদন্ত চাই। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনায় দোষিদের বিচারের মুখোমুখি আনয়ন অত্যন্ত জরুরি। কেননা, সভ্য সমাজে মানব হত্যা-নির্যাতন কল্পনাও করা যায় না।
বাংলাদেশের সমাজ যদি আদর্শভিত্তিক পরিবর্তিত না হয় তাহলে প্রেসফ্রিডমটা মূলত: সোনার হরিণ ছাড়া আর কিছুই নয়। দেশের মানুষ দেখেছেন, দুর্নীতিবাজরা সব সরকারের আমলেই নিয়ন্ত্রিত। আর এসব দুর্নীতিবাজ কিংবা কালো টাকার মালিকরাই বাংলাদেশে মিডিয়ার ওনারশিপের জায়গাটা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মিডিয়াকে ঘোষণা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কালো টাকার মালিক মিডিয়ার ওনারশিপে থাকায় তাদের মধ্যে একেবারেই ব্যতিক্রম ছাড়া কোন ইডিওলজি নেই। ফলে সাংবাদিকরা প্রথমত: সেলফসেন্সরশিপের মুখে পড়ে। সরকারি বিজ্ঞাপনকে ঘিরে দেশে মুড়ি-মুড়কির মত সংবাদপত্র বেরিয়েছে। এর কতগুলো জনগণের কল্যাণে কাজ করছে তাও আজ একটি বড় প্রশ্ন। সরকারের তরফ থেকে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের একটি অন্যতম বড় হাতিয়ার হলো বিজ্ঞাপন। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। তাছাড়া পেশাদারিত্বের সংকট বাংলাদেশে প্রেসফ্রিডমের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম বাধা।
দেশে প্রেসফ্রিডমের আরও একটা সমস্যা হলো কনটেম্পট টু কোর্ট এবং মানহানি। এ বিষয়ক সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা না থাকায় গণমাধ্যমকর্মীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক-প্রকাশকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ উঠেছে। কোনটা লিখলে আদালত অবমাননা হবে? তার কোন সৃনির্দিষ্ট বর্ণনা নেই কোথাও। এনিয়ে সাংবাদিক, সম্পাদক সকলেই একটা চরম ঝুঁকির মধ্যে। সর্বোপরি বাংলাদেশে কোন জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নেই। জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অভাব, সাংবাদিদের মধ্যে অনৈক্য, রাজনৈতিক বিভাজন, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন থামছে না। সাংবাদিক খুন বা নির্যাতিত হলে তার প্রতিকার মেলে না, বিচার হয় না। ফলে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনকারিরা উৎসাহিত হচ্ছে। সাংবাদিক সমাজ আমরা দেশে এযাবৎ সংঘটিত সকল সাংবাদিকসহ সকল হত্যা-নির্যাতনের বিচার চাই। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনসহ সকল হত্যা-নির্যাতনের প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে। যদি সমাজে সত্যিকারের আইনের শাসন, কার্যকর গণতন্ত্র থাকে। অত্যাচার-নির্যাতনের কোন প্রতিকার, বিচার, প্রতিবিধান নেই। এই যে একটা ধারণা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়েছে সেটাকে ভাঙা চাই। আর এটা করতে হলে চাই দেশপ্রেমিক জনঐক্য।
রাজনীতি, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের উর্দ্ধে ওঠে গণ জাগরণ গণবিপ্লব দরকার। গণবিপ্লবের মাধ্যমেই কেবল সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতরকার সমস্যাগুলোর সমাধান হতে পারে। সমাজ ও রাষ্ট্রে দায়মুক্তি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির শেকড় বেশ গভীরে। এটার প্রমাণ মেলে যখন আমরা দেখি, মানুষ হত্যাকান্ডের বিচার চান না। সহকর্মীর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর সাংবাদিক সমাজকে বলতে শুনেছি ’বিচার পাই না তাই বিচার চাই না’। এমন স্লোগান লিখে রাজপথে নামতে হয় সাংবাদিকদের। আমরা আশা করবো, এই অবস্থার পরিবর্তন হবে। আশার কথা হলো বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশে কমিউনিটি রেডিও নীতিমালা প্রণয়ন করে গেছে। মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট প্রণয়ন করেছে। এর মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি ধাপ এগিয়েছে বলে আমরা মনে করি। তবে এসব আইন প্রণয়ন করলেইতো আর হবে না। এগুলোকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে এবং কার্যকর করতে হবে।
বর্তমান সরকারের তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাসমূহ তুলে নেয়া হবে। ভাল কথা। রাজনৈতিক হয়রাণিমূলক মামলা তুলে নেয়াই উচিত। ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক হয়রাণিমূলক মামলা হয়েছে। আমি মনে করি, একটা বিষয় পরিস্কার হওয়া দরকার। সেটা হলো ধরুণ, একজন সাংবাদিক ’এক্স’। তিনি সত্যি সত্যি চাঁদাবাজি কিংবা অপরাধ করেছেন। তার মামলাও কী তবে তুলে নেয়া হবে? এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো-না সব মামলা তোলা উচিত হবে না। কেবলমাত্র যেসব মামলা রাজনৈতিব উদ্দেশ্য প্রণোদিত, মিথ্যা-হয়রাণিমূলক সেইসব মামলাই তুলে নেয়া হোক। অন্যথায় দেশে আইনের শাসন রক্ষা করা যাবে না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র আবার গণতন্ত্র ছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। কোনটাই ভাবা যায় না। সভ্য ও মানবিক কল্যাণমুখী সমাজে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটা পূর্বশর্ত। গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একে অপরের পরিপূরক। একটা ছাড়া অন্যটা অচল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের মাধ্যমে আজ (১০ জুলাই, ২০১০) কথা হলো আমার এক বন্ধু-সহকর্মীর সাথে। ফেইসবুক চেটিংকালে ওই বন্ধুটি জানালেন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ওপর তিনি চার পর্বের একটি সিরিজ প্রতিবেদন তৈরী করেন। যার অর্ধেক প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু অর্ধেকটা (দু’টি পর্ব)বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ সেনাবাহিনীর (র্যাব) চাপ। ২০০০ সালের ঠিক এই দিনে (১০ জুলাই) নিহত হয়েছিলেন বিখ্যাত সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবল। তিনি দৈনিক জনকণ্ঠের দক্ষিণালীয় প্রতিনিধি ছিলেন। নিজ অফিসে কর্মরত অবস্থায় তিনি সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান। এরপর দশটি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু খুনিদের বিচার হয়নি।
দৈনিক জনকণ্ঠ (১০ জুলাই, ২০১০) লিখেছে, ২০০১ সালে সিআইডি পুলিশ চাঞ্চল্যকর শামছুর রহমান হত্যা মামলায় ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে মামলার বর্ধিত তদন্ত করা হয়। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশে নিহত সাংবাদিক কেবলের বন্ধু সাংবাদিক ফারাজী আজমল হোসেনকে আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সরকার। আবার বাদ দেয়া হয় মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে। কিন্তু নতুন সাক্ষী করা হয় আসামিদের ঘনিষ্ঠজনদের। ২০০৫ সালের জুন মাসে এই মামলার সকল আসামির বিরুদ্ধে যশোরের ষ্পেশাল জজ আদালতে অভিযোগ গঠিত হয়। একই বছরের জুলাই মাসে বাদিকে না জানিয়ে মামলাটি খুলনার দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করে সরকার। মামলার অন্যতম আসামি খুলনার সন্ত্রাসী মুশফিকুর রহমান হিরক জামিন নিয়ে পলা
খুলনার আদালতে যাবার পর মামলার বাদি এ বং কয়েকজন সাক্ষীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হয়। সে সময় আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশে পুলিশ মামলার বাদি এবং সাক্ষীর বাড়িতে অভিযান চালায়। শহীদ শামছুর রহমানের স্ত্রী সেলিনা আকতার লাকি ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টে আপীল করেন। আপিলের আবেদনে বলা হয়, মামলার অন্যতম আসামি হিরক পলাতক রয়েছে। এই মামলার অন্যান্য আসামির সঙ্গে খুলনার সন্ত্রাসীদের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তাঁর পক্ষে খুলনায় গিয়ে সাক্ষ্য দেয়া সম্ভব নয়। এরই প্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি কেন যশোরে ফিরিয়ে দেয়া হবে তার জন্য সরকারের ওপর রুলনিশি জারি করে। বর্তমান মামলাটি সে অবস্থাতেই রয়েছে। মামলার এক আসামি খুলনার ওয়ার্ড কমিশনার আসাদুজ্জামান লিটু র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন। অপর আসামি কোটচাঁদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন কালু ২ বছর আগে স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করেন। অন্য আসামিরা জামিনে রয়েছে। কেবল ভাইয়ের মেয়ে সেজুঁতি ও প্রণতি চিরদিনের জন্য বাবার স্নেহ ও ভালবাসা থেকে বঞ্চিত। স্বামী হারানোর বেদনায় আজও কেঁদে ওঠেন লাকী ভাবি (কেবল ভাইয়ের স্ত্রী)। তিনি জানালেন প্রণতি বেড়ে উঠছে তার ‘ছবি বাবা’কে (কেবল ভাইয়ের ছবি দেখে)দেখে।
বাংলাদেশে ন্যায় বিচার, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এই বেহাল অবস্থা। অথচ গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি, রাজনৈতিক দুর্বত্তায়ন বাংলাদেশের গোটা সমাজ ব্যবস্থার উপরই চরম এক আঘাত। প্রকৃত এবং বাস্তবিক অর্থেই গণতন্ত্রের চর্চা ছাড়া এই অবস্থা থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই। দুর্নীতি, অশিক্ষা আর দারিদ্রতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারলেই কেবল গণতন্ত্রের পথ মসৃণ হতে পারে। সেই পথ দেখানোর দায়িত্বটা কিন্তু রাজনীতিবিদদেরই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সকল সাংবাদিক, রাজনৈতিক হত্যা-নির্যাতনের বিচার চাই আমরা। আইনমাফিক সকল ধরণের প্রভাবমুক্ত ন্যায্য বিচার।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিএনপি-জামায়াত আমলে ১৪ সাংবাদিক হত্যাকান্ডের তথ্য তুলে ধরেন। এই তথ্য যেমন সত্য তেমনি মহাজোট সরকারের আমলে ৫ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, এটাও সত্য। কিন্তু তিনি (প্রধানমন্ত্রী) অর্ধাংশ স্বীকার করে অর্ধেকটা অস্বীকার করেছেন পরোক্ষভাবে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে জনপ্রিয় একুশে টেলিভিশন বন্ধ করা হয়েছিল। এটা যেমন সত্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে চ্যানেল ওয়ান, যমুনা টিভি ও আমার দেশ বন্ধ হলো। উভয়ই সত্য। আমরা অর্ধসত্য নয় পুরো সত্য জানতে চাই। বাংলাদেশের অর্ধসত্য রাজনৈতিক অবস্থান পুরো সত্যের জায়গায় আসতে পারবে কী?
লিংক
লেবেলসমূহ:
মানবাধিকার
,
সাম্প্রতিক বিষয়
এর দ্বারা পোস্ট করা
suMon azaD (সুমন আজাদ)
বাংলাদেশে অপরাধের ব্যাপকতা, বৈচিত্র্য ও মাত্রা এখন এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যার সঙ্গে ভয়াবহ নৈরাজ্যিক পরস্থিতির পার্থক্য নেই। এই অপরাধের জগতেই এখন বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের বসবাস। এদিক দিয়ে গ্রাম ও শহরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এর সব থেকে বিপজ্জনক দিক হলো, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেই। উপরন্তু এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেখানে স্থানীয় জনগণ ঘটতে থাকা নির্যাতনের দৃশ্য নির্বিকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। সালিশের নামে রংপুরের বদরগঞ্জে গৃহবধূ নির্যাতনের এ ধরনের এক দৃশ্য 'সকালের খবর'-এর শেষ পৃষ্ঠায় আজ ছাপা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, গৃহবধূটিকে চিৎ করে ফেলে জন দুই লোক লাঠিপেটা করছে এবং স্থানীয় লোকজন চেয়ারে বসে ও চারদিক ঘিরে দাঁড়িয়ে থেকে এই দৃশ্য উপভোগ করছে! বিগত ৭ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে 'সালিশে প্রকাশ্যে দুই গৃহবধূকে লাঠিপেটা' শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে এর বিরুদ্ধে রুল জারি করে এই ঘটনার বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এ ধরনের ঘটনা গ্রামে নতুন বা ব্যতিক্রম নয়। নিয়মিতভাবেই এটা গ্রামাঞ্চলে বেশ কিছুদিন থেকে ঘটে চলেছে। এর বিরুদ্ধে অনেক প্রতিবাদ, হাইকোর্টের রুলিং ইত্যাদি হলেও এ ধরনের নারী নির্যাতন বন্ধের কোনো লক্ষণ এখনও পর্যন্ত নেই। বদরগঞ্জে সদ্য সংঘটিত ঘটনাটিই এর প্রমাণ।
গ্রামে যেমন আছে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা, তেমনি আছে অন্য ধরনের ঘটনা যা দেখা গেছে মাত্র কয়েকদিন আগে। ঢাকার গাবতলী-আমীনবাজার এলাকায় রাতে ডাকাত সন্দেহে ছয়জন ছাত্রকে গ্রামবাসী পিটিয়ে হত্যা করেছে। তাদের আটক করে, জিজ্ঞাসাবাদ করে, তাদের পরিচয় জানার কোনো প্রয়োজন তারা বোধ করেনি। ডাকাত ধরার নাম করে তারা নিজেদের খুনের স্পৃহা চরিতার্থ করতে গিয়েই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। একদিকে গৃহবধূ নির্যাতন ও সেই নির্যাতনের দৃশ্য দাঁড়িয়ে, বসে দেখা ও উপভোগ করা এবং অন্যদিকে এভাবে ছয়জন ছাত্রের পরিচয় জানার কোনো চেষ্টা না করে দল বেঁধে গ্রামবাসী কর্তৃক তাদের পিটিয়ে হত্যা করার মধ্যে অপরাধ প্রবণতার চারিত্রিক মিল অবশ্যই আছে।
আজকের দৈনিক সমকালেই মেঘনার জেলেদের ওপর একটি রিপোর্ট প্রথম পৃষ্ঠাতেই বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নদীতে এখন প্রচুর মাছ ধরা পড়লেও জলদস্যু নিজাম ও তার গ্রুপের সদস্যদের চাঁদা পরিশোধ করতে না পারায় নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না শত শত জেলে। নিজাম ডাকাত বড় নৌকাপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ও ছোট নৌকাপ্রতি ৩০-৪০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। এই চাঁদা পরিশোধ করে জেলেদের 'নিজাম ডাকাত টোকেন' সংগ্রহ না করলে নদীতে গিয়ে তাদের মাছ ধরার উপায় নেই। নদীতে টহল পুলিশের কোনো কথা এ রিপোর্টে না থাকলেও জলদস্যুরা যে পুলিশের কাছ থেকে টাকা খেয়েই অবাধে তাদের দস্যুবৃত্তি করে থাকে এতে সন্দেহ নেই!
প্রতিদিনই নানা ধরনের অপরাধ দেশজুড়ে এমনভাবে ঘটছে যাতে এটা মনে করা স্বাভাবিক যে, দেশে আইন-শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। এ অবস্থা রীতিমতো আতঙ্কজনক। কিন্তু এর থেকেও আতঙ্কজনক ব্যাপার এই যে, এই পরিস্থিতি দ্রুতগতিতে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে, পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হচ্ছে। বাংলাদেশে এটা কেন ঘটছে এর কারণ অনুসন্ধান করলে সহজেই বোঝা যাবে, সরকার ও বিভিন্ন রাষ্ট্রযন্ত্রের অপরাধমূলক তৎপরতাই মূলত এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে এবং এর অবনতি ঘটিয়ে চলেছে। বেপরোয়া ঘুষ, চুরি, দুর্নীতি থেকে নিয়ে খুন-জখম পর্যন্ত সবকিছুই এই প্রক্রিয়ার অন্তর্গত। মন্ত্রী, এমপি প্রমুখের দুর্নীতির ওপর রিপোর্ট নিয়মিতই প্রকাশিত হয়। আমলারাও এই দুর্নীতির বড় অংশীদার। দু'একদিন আগে জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, হুইপ, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য প্রমুখের আপ্যায়ন বাবদ বছরে কোটি কোটি টাকা খরচের একটা হিসাব বের হয়েছে। এতে দেখা যায়, তারা কে কত খরচ করবেন তার ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। ফুর্তির বশবর্তী হয়ে তারা যতই লাখ লাখ টাকা খরচ করুন তার কোনো বিরোধিতা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নেই। অন্য ধরনের দুর্নীতির কথা বাদ দিয়েও উচ্চতম পর্যায়ের এই আপ্যায়ন খরচও যে এক অবাধ দুর্নীতির ব্যাপার এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। এসবের সঙ্গে দেশে ক্রমবর্ধমান অপরাধের যোগ সম্পর্ক আছে। কিন্তু শারীরিক নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদির সঙ্গে যার যোগ সব থেকে বেশি তা হলো, পুলিশি নির্যাতন এবং পুলিশের নিজেরই অপরাধমূলক তৎপরতা। এই পুলিশের সঙ্গে সম্পর্কিত আছে র্যাবসহ বিভিন্ন ধরনের বাহিনী। পুলিশ যেখানে নাগরিকদের রক্ষকের ভূমিকা বাদ দিয়ে নিজেই তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ করে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে, সেখানে সমাজে অপরাধের বিস্তার যে অবাধে ঘটতে থাকবে এটা স্বাভাবিক।
পুলিশের অপরাধমূলক তৎপরতার সব থেকে বিপজ্জনক দিক হলো, প্রায়ই প্রকৃত অপরাধীকে ধরতে ব্যর্থ হয়ে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিয়ে নিরপরাধ লোককে অপরাধী সাজানোর জন্য নানা ক্রিমিনাল পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ। এটা কিছুদিন আগে লিমনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। আসল অপরাধীকে ছেড়ে দিয়ে তার মতো একজন নিরীহ ও নিরপরাধ ছাত্রকে গুলি করে তার পা নষ্ট করে দেওয়ার মতো অপরাধ যেখানে র্যাব নিজেই করে, সেখানে তার দ্বারা যে সাধারণ চোর, ডাকাত ও গুণ্ডারা উৎসাহিত হয়ে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে র্যাব-পুলিশের সহায়তায় আইনকে ফাঁকি দিয়ে নিজেরাও খুন-জখম করবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। লিমনের ব্যাপার নিয়ে দেশব্যাপী এত বিক্ষোভ ও লেখালেখি সত্ত্বেও র্যাব যে এখনও পর্যন্ত তাদের অপরাধমূলক অবস্থান থেকে একটুকুও নড়েনি, এটা অপরাধের জগৎ ভালোভাবেই লক্ষ্য করে। এর মধ্যেই তারা নিজেদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায়। এ জন্য বাংলাদেশে এখন অপরাধের যত ঘটনা ঘটছে সেগুলো যে শুধু র্যাব-পুলিশের নিজেদের অপরাধমূলক তৎপরতা থেকে উৎসাহ লাভ করেই ঘটছে তাই নয়। এসব ঘটনার অধিকাংশই ঘটছে তাদের সঙ্গে সাধারণ অপরাধীদের যোগসাজশের মাধ্যমে অথবা অপরাধী পাকড়াও করার ক্ষেত্রে তাদের নিষ্ক্রিয়তার জন্য। এ সম্পর্কিত রিপোর্ট এখন সংবাদপত্রের পাতায় নিয়মিত ব্যাপার।
পুলিশ যে তাদের অপরাধমূলক তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভকে মোটেই পরোয়া করে না, এর প্রধান কারণ পুলিশের অপরাধের জন্য তাদের দ্রুত শাস্তি তো দূরের কথা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো শাস্তির ব্যবস্থা সরকারিভাবে করা হয় না। পুলিশ যেভাবে অপরাধীদের নিজেদের নাকের ডগায় অপরাধ চালিয়ে যেতে অনেক ক্ষেত্রেই সহায়তা করে, তেমনি সরকার আবার পুলিশের অপরাধের শাস্তির ব্যবস্থা তো দূরের কথা, তাদের শাস্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টাই করে থাকে। সরকার ও সরকারি লোকজন নিজেরা যেসব অপরাধ করে তার জন্য পুলিশের সাহায্য তাদের প্রয়োজন হয়। কাজেই পুলিশকে অপরাধের শাস্তি থেকে রক্ষা করা হয়ে দাঁড়ায় সরকারের দায়িত্ব!
পুলিশের অপরাধমূলক বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের এই মুহূর্তের এক দৃষ্টান্ত হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরকে ডাকাত বলে গ্রেফতার করে, তাকে নিজেদের হেফাজতে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা। আবদুল কাদেরকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিরপরাধ জেনেও পুলিশ যে এখনও তার বিরুদ্ধে মামলা তুলে না নিয়ে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করছে এটা স্বাভাবিক অবস্থায় সম্ভব নয়। এটা সম্ভব হচ্ছে বর্তমানে সরকারি ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় দেশজুড়ে এক অস্বাভাবিক অপরাধের পরিবেশ গড়ে ওঠার কারণে। একের পর এক সরকার যদি নানা ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতায় নিজেরা জড়িত না থাকত এবং অপরাধ দমনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করত, তাহলে এই পরিস্থিতি দেশে এভাবে সৃষ্টি হতো না। অপরাধের জগৎ দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকা এবং চারদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা দাঁড়াত না। একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে, চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি, গৃহবধূ নির্যাতন, ক্রমবর্ধমান হারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ১০-২০ জনের মৃত্যু, নদীতে জলদস্যুদের অবাধ অপরাধ, লিমন ও কাদেরের মতো ছাত্রের ওপর র্যাব-পুলিশের নির্যাতন একই অপরাধের সূত্রে গ্রথিত আছে। এবং এসব অপরাধের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র আছে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকার ও রাষ্ট্রের অপরাধ দমন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা তো বটেই, উপরন্তু তাদের নিজেদেরই নানা ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতার।
Tue, 02/08/2011 - 2:48pm | by Badruddin.Umar
গ্রামে যেমন আছে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা, তেমনি আছে অন্য ধরনের ঘটনা যা দেখা গেছে মাত্র কয়েকদিন আগে। ঢাকার গাবতলী-আমীনবাজার এলাকায় রাতে ডাকাত সন্দেহে ছয়জন ছাত্রকে গ্রামবাসী পিটিয়ে হত্যা করেছে। তাদের আটক করে, জিজ্ঞাসাবাদ করে, তাদের পরিচয় জানার কোনো প্রয়োজন তারা বোধ করেনি। ডাকাত ধরার নাম করে তারা নিজেদের খুনের স্পৃহা চরিতার্থ করতে গিয়েই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। একদিকে গৃহবধূ নির্যাতন ও সেই নির্যাতনের দৃশ্য দাঁড়িয়ে, বসে দেখা ও উপভোগ করা এবং অন্যদিকে এভাবে ছয়জন ছাত্রের পরিচয় জানার কোনো চেষ্টা না করে দল বেঁধে গ্রামবাসী কর্তৃক তাদের পিটিয়ে হত্যা করার মধ্যে অপরাধ প্রবণতার চারিত্রিক মিল অবশ্যই আছে।
আজকের দৈনিক সমকালেই মেঘনার জেলেদের ওপর একটি রিপোর্ট প্রথম পৃষ্ঠাতেই বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নদীতে এখন প্রচুর মাছ ধরা পড়লেও জলদস্যু নিজাম ও তার গ্রুপের সদস্যদের চাঁদা পরিশোধ করতে না পারায় নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না শত শত জেলে। নিজাম ডাকাত বড় নৌকাপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ও ছোট নৌকাপ্রতি ৩০-৪০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। এই চাঁদা পরিশোধ করে জেলেদের 'নিজাম ডাকাত টোকেন' সংগ্রহ না করলে নদীতে গিয়ে তাদের মাছ ধরার উপায় নেই। নদীতে টহল পুলিশের কোনো কথা এ রিপোর্টে না থাকলেও জলদস্যুরা যে পুলিশের কাছ থেকে টাকা খেয়েই অবাধে তাদের দস্যুবৃত্তি করে থাকে এতে সন্দেহ নেই!
প্রতিদিনই নানা ধরনের অপরাধ দেশজুড়ে এমনভাবে ঘটছে যাতে এটা মনে করা স্বাভাবিক যে, দেশে আইন-শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। এ অবস্থা রীতিমতো আতঙ্কজনক। কিন্তু এর থেকেও আতঙ্কজনক ব্যাপার এই যে, এই পরিস্থিতি দ্রুতগতিতে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে, পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হচ্ছে। বাংলাদেশে এটা কেন ঘটছে এর কারণ অনুসন্ধান করলে সহজেই বোঝা যাবে, সরকার ও বিভিন্ন রাষ্ট্রযন্ত্রের অপরাধমূলক তৎপরতাই মূলত এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে এবং এর অবনতি ঘটিয়ে চলেছে। বেপরোয়া ঘুষ, চুরি, দুর্নীতি থেকে নিয়ে খুন-জখম পর্যন্ত সবকিছুই এই প্রক্রিয়ার অন্তর্গত। মন্ত্রী, এমপি প্রমুখের দুর্নীতির ওপর রিপোর্ট নিয়মিতই প্রকাশিত হয়। আমলারাও এই দুর্নীতির বড় অংশীদার। দু'একদিন আগে জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, হুইপ, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য প্রমুখের আপ্যায়ন বাবদ বছরে কোটি কোটি টাকা খরচের একটা হিসাব বের হয়েছে। এতে দেখা যায়, তারা কে কত খরচ করবেন তার ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। ফুর্তির বশবর্তী হয়ে তারা যতই লাখ লাখ টাকা খরচ করুন তার কোনো বিরোধিতা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নেই। অন্য ধরনের দুর্নীতির কথা বাদ দিয়েও উচ্চতম পর্যায়ের এই আপ্যায়ন খরচও যে এক অবাধ দুর্নীতির ব্যাপার এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। এসবের সঙ্গে দেশে ক্রমবর্ধমান অপরাধের যোগ সম্পর্ক আছে। কিন্তু শারীরিক নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদির সঙ্গে যার যোগ সব থেকে বেশি তা হলো, পুলিশি নির্যাতন এবং পুলিশের নিজেরই অপরাধমূলক তৎপরতা। এই পুলিশের সঙ্গে সম্পর্কিত আছে র্যাবসহ বিভিন্ন ধরনের বাহিনী। পুলিশ যেখানে নাগরিকদের রক্ষকের ভূমিকা বাদ দিয়ে নিজেই তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ করে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে, সেখানে সমাজে অপরাধের বিস্তার যে অবাধে ঘটতে থাকবে এটা স্বাভাবিক।
পুলিশের অপরাধমূলক তৎপরতার সব থেকে বিপজ্জনক দিক হলো, প্রায়ই প্রকৃত অপরাধীকে ধরতে ব্যর্থ হয়ে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিয়ে নিরপরাধ লোককে অপরাধী সাজানোর জন্য নানা ক্রিমিনাল পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ। এটা কিছুদিন আগে লিমনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। আসল অপরাধীকে ছেড়ে দিয়ে তার মতো একজন নিরীহ ও নিরপরাধ ছাত্রকে গুলি করে তার পা নষ্ট করে দেওয়ার মতো অপরাধ যেখানে র্যাব নিজেই করে, সেখানে তার দ্বারা যে সাধারণ চোর, ডাকাত ও গুণ্ডারা উৎসাহিত হয়ে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে র্যাব-পুলিশের সহায়তায় আইনকে ফাঁকি দিয়ে নিজেরাও খুন-জখম করবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। লিমনের ব্যাপার নিয়ে দেশব্যাপী এত বিক্ষোভ ও লেখালেখি সত্ত্বেও র্যাব যে এখনও পর্যন্ত তাদের অপরাধমূলক অবস্থান থেকে একটুকুও নড়েনি, এটা অপরাধের জগৎ ভালোভাবেই লক্ষ্য করে। এর মধ্যেই তারা নিজেদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায়। এ জন্য বাংলাদেশে এখন অপরাধের যত ঘটনা ঘটছে সেগুলো যে শুধু র্যাব-পুলিশের নিজেদের অপরাধমূলক তৎপরতা থেকে উৎসাহ লাভ করেই ঘটছে তাই নয়। এসব ঘটনার অধিকাংশই ঘটছে তাদের সঙ্গে সাধারণ অপরাধীদের যোগসাজশের মাধ্যমে অথবা অপরাধী পাকড়াও করার ক্ষেত্রে তাদের নিষ্ক্রিয়তার জন্য। এ সম্পর্কিত রিপোর্ট এখন সংবাদপত্রের পাতায় নিয়মিত ব্যাপার।
পুলিশ যে তাদের অপরাধমূলক তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভকে মোটেই পরোয়া করে না, এর প্রধান কারণ পুলিশের অপরাধের জন্য তাদের দ্রুত শাস্তি তো দূরের কথা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো শাস্তির ব্যবস্থা সরকারিভাবে করা হয় না। পুলিশ যেভাবে অপরাধীদের নিজেদের নাকের ডগায় অপরাধ চালিয়ে যেতে অনেক ক্ষেত্রেই সহায়তা করে, তেমনি সরকার আবার পুলিশের অপরাধের শাস্তির ব্যবস্থা তো দূরের কথা, তাদের শাস্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টাই করে থাকে। সরকার ও সরকারি লোকজন নিজেরা যেসব অপরাধ করে তার জন্য পুলিশের সাহায্য তাদের প্রয়োজন হয়। কাজেই পুলিশকে অপরাধের শাস্তি থেকে রক্ষা করা হয়ে দাঁড়ায় সরকারের দায়িত্ব!
পুলিশের অপরাধমূলক বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের এই মুহূর্তের এক দৃষ্টান্ত হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরকে ডাকাত বলে গ্রেফতার করে, তাকে নিজেদের হেফাজতে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা। আবদুল কাদেরকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিরপরাধ জেনেও পুলিশ যে এখনও তার বিরুদ্ধে মামলা তুলে না নিয়ে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করছে এটা স্বাভাবিক অবস্থায় সম্ভব নয়। এটা সম্ভব হচ্ছে বর্তমানে সরকারি ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় দেশজুড়ে এক অস্বাভাবিক অপরাধের পরিবেশ গড়ে ওঠার কারণে। একের পর এক সরকার যদি নানা ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতায় নিজেরা জড়িত না থাকত এবং অপরাধ দমনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করত, তাহলে এই পরিস্থিতি দেশে এভাবে সৃষ্টি হতো না। অপরাধের জগৎ দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকা এবং চারদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা দাঁড়াত না। একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে, চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি, গৃহবধূ নির্যাতন, ক্রমবর্ধমান হারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ১০-২০ জনের মৃত্যু, নদীতে জলদস্যুদের অবাধ অপরাধ, লিমন ও কাদেরের মতো ছাত্রের ওপর র্যাব-পুলিশের নির্যাতন একই অপরাধের সূত্রে গ্রথিত আছে। এবং এসব অপরাধের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র আছে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকার ও রাষ্ট্রের অপরাধ দমন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা তো বটেই, উপরন্তু তাদের নিজেদেরই নানা ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতার।
Tue, 02/08/2011 - 2:48pm | by Badruddin.Umar
লেবেলসমূহ:
সাম্প্রতিক বিষয়
এর দ্বারা পোস্ট করা
suMon azaD (সুমন আজাদ)
২৬জুন বদরগঞ্জে এক সালিস বৈঠকের নামে এক ফতোয়াবাজীর ঘটনায় হ্যাপী ও সাঈদাকে চরিত্রহীন অপবাদ দিয়ে প্রকাশ্যে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এরপর তাদের মাওলানা ডেকে এনে তওবা পড়ানো হয়। এই খবরটি বাংলাদেশের অনেক পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এসেছে। টিভিতে প্রকাশ্যে দেখানো হয়েছে দুই নারীকে জনসমখ্যে লাঠি দিয়ে পিটানো হচ্ছে। গ্রামবাসী সবাই গোল হয়ে বসে প্রত্যক্ষ করেছেন এই সালিশের নামে অমানুষিক বর্বরতা। তারপর আবার যখন একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলের রিপোর্টাররা সংবাদ সংগ্রহ করতে যায়, তখন বিচারকারী আয়নাল চেয়ারম্যানের লোকজন তাদের মারধর করে অবরোদ্ধ করে রাখে।
কথা হচ্ছে একটি দেশে বিদ্ধমান আইন এবং বিচার ব্যবস্থা চলমান থাকা অবস্থায় কোনো একটি এলাকার প্রভাবশালীরা কিভাবে এবং কোন সাহসের আইন নিজেদের হাতে তুলে নেয়। আবার অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পর, এতো মিডিয়ায় চলে আসার পর ঘটনার মূল হোতা আয়নাল চেয়ারম্যান কিভাবে ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকে? এই হোতাদের পরিচয় এবং বিচার কি বাংলাদেশে সম্ভব নয়? কথা হচ্ছে, জন প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা কেউই তো আইনের উর্ধ্বে নয়। তাই যারা বদরগঞ্জ উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের রাজারামপুর কাশীগঞ্জ গ্রামে সালিসের নামে ফতোয়া দিয়ে দুই নারীকে প্রকাশ্যে অমানুষিক নির্যাতন করেছে তারা হিংস্র পশুর সামিল। তাই তাদের দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হওয়া কি উচিত নয়? তা না হলে এ দেশের নারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও হুমকির মধ্যে পড়বে। এ ধরনের অপরাধ প্রবনতা আরও বেড়ে যাবে।
হ্যাপি ও সাঈদাকে এখনও অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তাদের চিকিৎসা নিতে দেয়া হয়নি। তাদের বাজারে যেতে এবং পাড়া মহল্লায় কারও বাড়ি যাওয়ার বিষয়ে বিধি নিষেধ জারি করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত হুমকি দেয়া হচ্ছে। নির্যাতনের বিষয়ে কাউকে কিছু বললে তাদের সন্তানসহ আত্মীয় স্বজনদের হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। একটি সভ্য সমাজে এধরণের নির্যাতন কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থ করতে হবে। মূলহোতারা যত শক্তিশালীই হোকনা কেন তাদের আইনের আওতায় আনতেই হবে। ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আনিছুল ইসলাম মন্ডল বলেছেন, 'এটা একটা ছোট ঘটনা। এর চেয়ে বড় ঘটনা দেশে ঘটছে।' তিনি বিষয়টিকে ছোট ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন যা কখনোই একজন জন প্রতিনিধির কাছ থেকে আশা করা যায়না। একজন জনপ্রতিনীধি যদি ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য এমন মন্তব্য করেন, তাহলে দেশে তো এ ধরণের ঘটনা দিনদিন বৃদ্ধিই পাবে। এমন ঘটনা অমানবিক। নারীর প্রতি চরম অবমাননা এবং নারী অগ্রগতির অন্তরায়। এর সঠিক এবং সুষ্ট বিচার সবাই কামনা করেন। ঘটনার মূল হোতা আয়নাল চেয়ারম্যানকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিতে হবে। সেই সাথে হ্যাপি ও সাইদার জীবনের নিরাপত্তা ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
লেবেলসমূহ:
সাম্প্রতিক বিষয়
এর দ্বারা পোস্ট করা
suMon azaD (সুমন আজাদ)
বাংলাদেশে আরো যেসকল সমস্যা রযেছে তার মধ্যে অনালোচিত এবং নীরবে বেড়ে চলা সমস্যা হচ্ছে নারী নির্যাতন। নারীদের প্রতি পুরুষের শারীরিক ও মানুষিক নির্যাতনের প্রকার এত প্রকট যে গ্রাম এলকার ধর্মপ্রাণ মানুষজন মনে করেন এটাই বুঝি নিয়ম! নির্যাতনকে নিয়মের আওতাভুক্ত মনে করে অনেকেই এর প্রতিবাদ করার কথা ভাবেনই না।
লেবেলসমূহ:
সাম্প্রতিক বিষয়
এর দ্বারা পোস্ট করা
suMon azaD (সুমন আজাদ)
আবারো হরতাল ডাকলো বিরোধী দল। বাংলাদেশেরে প্রতিবাদের একমাত্র ভাষা যেনো এই হরতাল।
তিন বছরের বিরতির পর দক্ষিণ এশীয় প্রতিবাদের হাতিয়ার হরতাল আবার ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। দেশের বিরোধী দলীয় জোট গত রোববার থেকে লাগাতার ৩৬ ঘন্টার হরতাল ডেকেছে।
আমাদের দেশের হরতালের সংস্কৃতি হচ্ছে পূর্বের রাতে মিছিল করে কয়ে
হরতালের পূর্বের রাতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে যায় যখন কয়েকটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া। যেনো এই খবর রাতারাতি সারাদেশে মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং সবার মধ্যে হরতালকে ঘিরে আতংক কাজ করে। তাই রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন অংশে গাড়ি ও বাস জ্বালিয়ে দেয়া হবে যার ফলে কয়েকজন যাত্রীও বীভৎস ভাবে পুড়ে যাবে।
চলুন তাহলে জানা যাক এই হরতাল সংস্কৃতির কিছু তথ্য:
“গুজরাটী শব্দ “হরতাল” কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে ব্যবহার করেছেন তা বোধ হয় বিশ্বের কোন দেশই করতে পারেন নি। [..] আর হরতালের আভিধানিক অর্থ যা ই থাকুক না কেন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হরতালের সংজ্ঞা হচ্ছে- এদেশ আমার বাপ-দাদার, চাইলেই বন্ধ করে দেব সবকিছু।”
বাংলাদেশের মানুষেরও আত্মার সাথে মিশে গেছে হরতাল। হরতাল আমাদের সংস্কৃতির ও একটা অংশ। হরতালের তারিখ নির্ধারণ মানেই হচ্ছে- আজকে আমার দোকানটা বন্ধ থাকবে, না হয় লুট হবে। আজকে আমার কষ্টার্জিত উপার্জনে কেনা শখের গাড়িটা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হবে। হরতাল মানেই হচ্ছে আজকে আমার কাজে যাওয়া হবে না। বড় কর্তার বকুনি। নয়তো ছেলেমেয়ে নিয়ে না খেয়ে থাকা।
এসবই পুরনো কথা। দীর্ঘ প্রায় আড়াই তিন বছর পর আবার শুরু হচ্ছে হরতাল। এ আড়াই তিন বছরে বাংলাদেশের জনগন বোধহয় ভুলেই গিয়েছিলেন হরতাল শব্দটি। এরই ফলে তারা হয়তো আর হরতাল চায় না। কিন্তু তারা না চাইলেই কি হবে, নেতারা তো চান! [..]
মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী কি ভেবে দেখেছেন, হরতাল হলে দেশের একদিনে ক্ষতি কত হবে? কত মানুষের ভোগান্তি হবে? অবশ্য এসব আপনাদের ভাববার কথা নয়, কারণ আপনারা জনগন দিয়ে রাজনীতি করেন জনগণের জন্য নয়। তাই জনগনের কি ক্ষতি হলো তা ভাববার মতো সময় আপনার কোথায়?
তিন বছরের বিরতির পর দক্ষিণ এশীয় প্রতিবাদের হাতিয়ার হরতাল আবার ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। দেশের বিরোধী দলীয় জোট গত রোববার থেকে লাগাতার ৩৬ ঘন্টার হরতাল ডেকেছে।
আমাদের দেশের হরতালের সংস্কৃতি হচ্ছে পূর্বের রাতে মিছিল করে কয়ে
হরতালের পূর্বের রাতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে যায় যখন কয়েকটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া। যেনো এই খবর রাতারাতি সারাদেশে মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং সবার মধ্যে হরতালকে ঘিরে আতংক কাজ করে। তাই রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন অংশে গাড়ি ও বাস জ্বালিয়ে দেয়া হবে যার ফলে কয়েকজন যাত্রীও বীভৎস ভাবে পুড়ে যাবে।
চলুন তাহলে জানা যাক এই হরতাল সংস্কৃতির কিছু তথ্য:
“গুজরাটী শব্দ “হরতাল” কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে ব্যবহার করেছেন তা বোধ হয় বিশ্বের কোন দেশই করতে পারেন নি। [..] আর হরতালের আভিধানিক অর্থ যা ই থাকুক না কেন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হরতালের সংজ্ঞা হচ্ছে- এদেশ আমার বাপ-দাদার, চাইলেই বন্ধ করে দেব সবকিছু।”
বাংলাদেশের মানুষেরও আত্মার সাথে মিশে গেছে হরতাল। হরতাল আমাদের সংস্কৃতির ও একটা অংশ। হরতালের তারিখ নির্ধারণ মানেই হচ্ছে- আজকে আমার দোকানটা বন্ধ থাকবে, না হয় লুট হবে। আজকে আমার কষ্টার্জিত উপার্জনে কেনা শখের গাড়িটা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হবে। হরতাল মানেই হচ্ছে আজকে আমার কাজে যাওয়া হবে না। বড় কর্তার বকুনি। নয়তো ছেলেমেয়ে নিয়ে না খেয়ে থাকা।
এসবই পুরনো কথা। দীর্ঘ প্রায় আড়াই তিন বছর পর আবার শুরু হচ্ছে হরতাল। এ আড়াই তিন বছরে বাংলাদেশের জনগন বোধহয় ভুলেই গিয়েছিলেন হরতাল শব্দটি। এরই ফলে তারা হয়তো আর হরতাল চায় না। কিন্তু তারা না চাইলেই কি হবে, নেতারা তো চান! [..]
মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী কি ভেবে দেখেছেন, হরতাল হলে দেশের একদিনে ক্ষতি কত হবে? কত মানুষের ভোগান্তি হবে? অবশ্য এসব আপনাদের ভাববার কথা নয়, কারণ আপনারা জনগন দিয়ে রাজনীতি করেন জনগণের জন্য নয়। তাই জনগনের কি ক্ষতি হলো তা ভাববার মতো সময় আপনার কোথায়?
লেবেলসমূহ:
সাম্প্রতিক বিষয়
এর দ্বারা পোস্ট করা
suMon azaD (সুমন আজাদ)
আব্দুল মান্নান
আওয়ামীলীগ এবং বিএনপিকে যদি কেউ সমর্থন নাও করে, তাহলেও তাকে এই কথা স্বীকার করতেই হবে দুই দলের ছত্র ছায়ায় বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। ফলে দুই দলের নীতি ও আদর্শ বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের নীতি ও আদর্শ সম্বন্ধে একটা ধারণা লাভ করা যাবে। মূলতঃ জনগণের নীতি নৈতিকতা বা আদর্শ নিয়ে আলোচনা করা আজকের লিখার মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নয়। বরং বৃহৎ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের নীতি ও আদর্শই হবে আজকের আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু।
কোন ব্যক্তি, দল, গোত্র ইত্যাদির সাথে অন্য কোন ব্যক্তি, দল, গোত্রের বেশীর ভাগ বৈশিষ্ট্যের মিল দেখা গেলে বেচারা মুদ্রাকে আমরা টেনে আনি। কোন মুদ্রার দুই পিঠে দুই রকম ছবি দেখলেও মুদ্রাটি কিন্তু একটা অবিভাজ্য বস্তু। দুই রকম ছবি দেখে আমরা বিভ্রান্ত হলেও হতে পারি। কিন্তু মুদ্রা এবং ছবি একই ধাতু থেকে তৈরি হওয়ার কারণে দুই ছবির মধ্যে নাড়ীর মিল থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কাজেই এ লিখাতে বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য রেখে প্রমাণ করার চেষ্টা থাকবে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির নাড়ী একটাই।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন 'আওয়ামী মুসলিম লীগ' নামে প্রথম দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ হিসাবে পরিচয় দেয়ার লক্ষ্যে দলটি পরবর্তীতে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ‘আওয়ামীলীগ’ নাম ধারণ করে। আওয়ামীলীগের জন্ম পাকিস্তান আমলে হলেও দ্বিতীয় দলটি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামীলীগের বড় ভূমিকা ছিল যা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। যার ফলে আওয়ামীলীগের নেতা ও কর্মীরা বলে থাকেন তাঁরা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। বিএনপির জন্ম যেহেতু স্বাধীনতার পর সেহেতু দল হিসাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কোন সুযোগ তাদের ছিলনা। তবে এ দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একজন মুক্তিযোদ্ধার দ্বারা এবং বহু মুক্তিযোদ্ধা এ দলের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যোগ দিয়েছেলেন। তাছাড়াও ত্রিশ শতাংশের বেশী সমর্থক আছে যা প্রধানত আওয়ামীলীগ থেকেই আসা। সে হিসাবে এ দলের নেতৃবৃন্দরাও দাবি করে থাকেন তাঁরাও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। আবার এটাও সত্য কথিত স্বাধীনতার বিপক্ষের কিছু লোক উভয় দলেও আছে।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য আওয়ামীলীগের আন্দোলন দীর্ঘ দিনের। তদানীন্তন পাকিস্তানে গণতন্ত্র ফিরে আনার ব্যাপারে তাদের অবদান অনস্বীকার্য এবং গণতন্ত্রের মাধ্যমে তারা ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল। অপর পক্ষে বিএনপির আত্মপ্রকাশ ঘটে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে এবং তা হয়েছিলে একটি অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। সে জন্যে বলা হয়ে থাকে বিএনপি হচ্ছে ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেয়া একটি দল। কিন্তু ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় আমরা এও দেখেছি কিভাবে একটি দল গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে অগণতান্ত্রিক হয় এবং অগণতান্ত্রিক খোলস পরিবর্তন করে কিভাবে গণতান্ত্রিক দলে পরিণত হয়।
আওয়ামীলীগের অবিসংবাদিত নেতা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ মরহুম শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে এবং চারটি সংবাদ পত্র ছাড়া অন্যগুলিকে বন্ধ করে দিয়ে গণতন্ত্রের গলা কিভাবে চেপে ধরেছিল তাও ইতিহাসে আছে। পক্ষান্তরে অগণতান্ত্রিক সরকারের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়ার শাসনামলে ১৯৭৬ সালে পলিটিক্যাল পার্টিজ রেগুলেশনের (PPR) আওতায় রাজনৈতিক দল গঠনের অনুমতি দিয়ে গণতন্ত্রের ধারা ফিরে এনেছিলেন তাও আমাদের জানা। ১৯৮৬ সালে সামরিক ও স্বৈর শাসক জেনারেল এরশাদকে সার্বিকভাবে সহযোগীতা করেছিল আওয়ামীলীগ। ২০০৮ সালে সামরিক শক্তির বলয়ে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নির্লজ্জ ভাবে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল আওয়ামীলীগ তাতো চোখের সামনেই রয়েছে। স্বার্থ হাসিলের জন্য উভয় দলই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আলিঙ্গন করেছিল সেটাও লিখা রয়েছে। উল্লেখ্য বিএনপি ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেয়া একটি দল হলেও গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসার পর আর অগণতান্ত্রিক পথে পা বাড়াইনি। কিন্তু আওয়ামীলীগ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তা করেছে বার বার।
আওয়ামীলীগ শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন এবং বিএনপি জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যস্ত। উভয় দলের নেতৃবৃন্দ জনগণের স্বপ্ন নিয়ে ভাবেননা। দল দুটি সাংঘাতিক ভাবে জড়িয়ে পড়েছে পারিবারতন্ত্রে। উভয় দলে বাঘা বাঘা নেতা থাকার পরেও পরিবারের প্রভাব এতটাই প্রবল যে শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া অথবা উভয় পরিবারের কোন সদস্য ছাড়া অন্য কারো পক্ষে দলের প্রধান হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। উভয় দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা নেই।
ডান ও বামের সুন্দর সংমিশ্রণে গঠিত হয়েছে দুই দলের নেতৃত্ব। এক সময় যাঁরা বাম ঘরানার তুখোড় নেতা ছিলেন তাঁরা এখন তাঁদের আদর্শকে মিছে-মিছি জলাঞ্জলি দিয়ে দুই নেত্রীর আঁচলের ছায়া মাড়ানোর চেষ্টা করছেন। দুই দলের প্রতিষ্ঠাতাগণ চিন্তা-চেতনায় ছিলেন ডান ঘরানার। কিন্তু বর্তমানের অবস্থা এতটাই করুণ যে বামের ঠেলায় স্ব স্ব দলের মূল চেতনাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। বামদের সুন্দর যুক্তিও প্রণিধানযোগ্য। এত লম্বা সময় ধরে দলে থাকার পরেও তারা কিভাবে বাম থাকে। কিন্তু তাঁরা কৌশলে তাঁদের আদর্শের অনেক কিছুই ঢুকিয়ে দিচ্ছে জাতীয় বিভিন্ন নীতিমালার মধ্যে। জ্বলন্ত প্রমাণ শিক্ষানীতি ও নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১। অন্যদিকে বিএনপির আমলে ধর্মীয় মূলবোধের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধা প্রদান ছিল বামদের একই ধরনের খেলা।
আওয়ামীলীগ ঢাক-ঢোল পিটে প্রচার করে দলটি সেক্যুলারেজমের ধারক ও বাহক। পক্ষান্তরে বিএনপি সেক্যুলার দল হলেও দেশের মানুষকে বোকা বানানোর জন্যে ঘুরে-ফিরে কথা বলে বুঝানোর চেষ্টা করে তারা ধর্মীয় মূলবোধে বিশ্বাসী। আওয়ামীলীগ সেক্যুলারেজমের আদর্শ ধারন করতে যে অক্ষম তা সংবিধান সংশোধন করতে গিয়ে তাদের নীতিগত অবস্থানের দোদুল্যমানতা তার প্রমাণ বহন করে। অপর দিকে বিএনপি ক্ষমতায় থেকে অথবা বাইরে থেকেও ধর্মীয় মূলবোধ রক্ষার্থে কিছুই করেনি। বিসমিল্লাহ্, আল্লাহর উপর আস্থা এবং রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে উভয় দলের মধ্যে চমৎকার মিল রয়েছে।
এক দল বাঙ্গালী এবং অন্য দল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী বলি আর কুরআন-সুন্নাহ্ বিরোধী আইন প্রণয়ন করবোনা বলি, জাতীয়তাবাদী হিসাবে দাবি করলে ধর্মীয় মূল্যবোধে এবং কুরআন-সুন্নাহর উপস্থাপিত চেতনার সাথে তা হবে সাংঘর্ষিক। কুরআন-সুন্নাহ্ জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে মত দেয়। কুরআনের আহবান পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য।
উভয় দলই ধর্মের নয়, ধর্মের নামে রাজনীতি করে। নির্বাচনের আগে কিছু কিছু তথাকথিত আলেমদেরকে সাথে রাখা এবং ইসলামী দলের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া, কোন পীরের মাজার থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করা, রাজনীতিকগণের দোয়ার জন্য মাথায় টুপি দেয়া ইত্যাদি ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগানো ছাড়া আর কিছুই না। দুই দলের লোক দেখানো ধর্মপ্রীতির ব্যাপারে আরো উদাহরণ দেয়া যাবে। রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগানোই হচ্ছে ধর্মের নামে রাজনীতি এবং উভয় দলই একাজে পারদর্শী।
আপাতদৃষ্টিতে বিএনপিকে ভারত বিরোধী মনে হলেও অতীতে দেশ পরিচালনার সময় ভারত তোষণ নীতি কারোর চোখকে ফাঁকি দিতে পারবেনা। আর এ ব্যাপারে আওয়ামীলীগের কথা না বলাই ভাল।
উরোক্ত বিষয়গুলি দিকে খেয়াল রাখলে যে কোন মানুষ সহজেই অনুমান করতে পারবে দল দুটির মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু একটাই আর তা হলো ক্ষমতার লড়াইয়ে দুই দল দুই মেরুতে অবস্থান নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধাচরণ করা।
দেশের অধিকাংশ মানুষের দুই দলের প্রতি সমর্থন থাকলেও তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, একথা স্বীকার করতেই হবে দুই দলের মাধ্যমে দেশে গুণগত কোন পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বিগত চল্লিশ বছরের কর্ম কান্ডই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যাদের নির্দিষ্ট কোন আদর্শ নেই তাদের কাছে ভাল কিছু আশা করা বাতুলতা ছাড়া আর কিছুই না। তাই সময় এসেছে দেশের স্বার্থে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের সন্ধানে নিজেদের বিবেক ও বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে সঠিক দল বেছে নেয়ার।
আওয়ামীলীগ এবং বিএনপিকে যদি কেউ সমর্থন নাও করে, তাহলেও তাকে এই কথা স্বীকার করতেই হবে দুই দলের ছত্র ছায়ায় বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। ফলে দুই দলের নীতি ও আদর্শ বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের নীতি ও আদর্শ সম্বন্ধে একটা ধারণা লাভ করা যাবে। মূলতঃ জনগণের নীতি নৈতিকতা বা আদর্শ নিয়ে আলোচনা করা আজকের লিখার মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নয়। বরং বৃহৎ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের নীতি ও আদর্শই হবে আজকের আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু।
কোন ব্যক্তি, দল, গোত্র ইত্যাদির সাথে অন্য কোন ব্যক্তি, দল, গোত্রের বেশীর ভাগ বৈশিষ্ট্যের মিল দেখা গেলে বেচারা মুদ্রাকে আমরা টেনে আনি। কোন মুদ্রার দুই পিঠে দুই রকম ছবি দেখলেও মুদ্রাটি কিন্তু একটা অবিভাজ্য বস্তু। দুই রকম ছবি দেখে আমরা বিভ্রান্ত হলেও হতে পারি। কিন্তু মুদ্রা এবং ছবি একই ধাতু থেকে তৈরি হওয়ার কারণে দুই ছবির মধ্যে নাড়ীর মিল থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কাজেই এ লিখাতে বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য রেখে প্রমাণ করার চেষ্টা থাকবে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির নাড়ী একটাই।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন 'আওয়ামী মুসলিম লীগ' নামে প্রথম দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ হিসাবে পরিচয় দেয়ার লক্ষ্যে দলটি পরবর্তীতে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ‘আওয়ামীলীগ’ নাম ধারণ করে। আওয়ামীলীগের জন্ম পাকিস্তান আমলে হলেও দ্বিতীয় দলটি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামীলীগের বড় ভূমিকা ছিল যা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। যার ফলে আওয়ামীলীগের নেতা ও কর্মীরা বলে থাকেন তাঁরা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। বিএনপির জন্ম যেহেতু স্বাধীনতার পর সেহেতু দল হিসাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কোন সুযোগ তাদের ছিলনা। তবে এ দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একজন মুক্তিযোদ্ধার দ্বারা এবং বহু মুক্তিযোদ্ধা এ দলের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যোগ দিয়েছেলেন। তাছাড়াও ত্রিশ শতাংশের বেশী সমর্থক আছে যা প্রধানত আওয়ামীলীগ থেকেই আসা। সে হিসাবে এ দলের নেতৃবৃন্দরাও দাবি করে থাকেন তাঁরাও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। আবার এটাও সত্য কথিত স্বাধীনতার বিপক্ষের কিছু লোক উভয় দলেও আছে।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য আওয়ামীলীগের আন্দোলন দীর্ঘ দিনের। তদানীন্তন পাকিস্তানে গণতন্ত্র ফিরে আনার ব্যাপারে তাদের অবদান অনস্বীকার্য এবং গণতন্ত্রের মাধ্যমে তারা ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল। অপর পক্ষে বিএনপির আত্মপ্রকাশ ঘটে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে এবং তা হয়েছিলে একটি অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। সে জন্যে বলা হয়ে থাকে বিএনপি হচ্ছে ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেয়া একটি দল। কিন্তু ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় আমরা এও দেখেছি কিভাবে একটি দল গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে অগণতান্ত্রিক হয় এবং অগণতান্ত্রিক খোলস পরিবর্তন করে কিভাবে গণতান্ত্রিক দলে পরিণত হয়।
আওয়ামীলীগের অবিসংবাদিত নেতা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ মরহুম শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে এবং চারটি সংবাদ পত্র ছাড়া অন্যগুলিকে বন্ধ করে দিয়ে গণতন্ত্রের গলা কিভাবে চেপে ধরেছিল তাও ইতিহাসে আছে। পক্ষান্তরে অগণতান্ত্রিক সরকারের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়ার শাসনামলে ১৯৭৬ সালে পলিটিক্যাল পার্টিজ রেগুলেশনের (PPR) আওতায় রাজনৈতিক দল গঠনের অনুমতি দিয়ে গণতন্ত্রের ধারা ফিরে এনেছিলেন তাও আমাদের জানা। ১৯৮৬ সালে সামরিক ও স্বৈর শাসক জেনারেল এরশাদকে সার্বিকভাবে সহযোগীতা করেছিল আওয়ামীলীগ। ২০০৮ সালে সামরিক শক্তির বলয়ে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নির্লজ্জ ভাবে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল আওয়ামীলীগ তাতো চোখের সামনেই রয়েছে। স্বার্থ হাসিলের জন্য উভয় দলই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আলিঙ্গন করেছিল সেটাও লিখা রয়েছে। উল্লেখ্য বিএনপি ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেয়া একটি দল হলেও গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসার পর আর অগণতান্ত্রিক পথে পা বাড়াইনি। কিন্তু আওয়ামীলীগ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তা করেছে বার বার।
আওয়ামীলীগ শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন এবং বিএনপি জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যস্ত। উভয় দলের নেতৃবৃন্দ জনগণের স্বপ্ন নিয়ে ভাবেননা। দল দুটি সাংঘাতিক ভাবে জড়িয়ে পড়েছে পারিবারতন্ত্রে। উভয় দলে বাঘা বাঘা নেতা থাকার পরেও পরিবারের প্রভাব এতটাই প্রবল যে শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া অথবা উভয় পরিবারের কোন সদস্য ছাড়া অন্য কারো পক্ষে দলের প্রধান হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। উভয় দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা নেই।
ডান ও বামের সুন্দর সংমিশ্রণে গঠিত হয়েছে দুই দলের নেতৃত্ব। এক সময় যাঁরা বাম ঘরানার তুখোড় নেতা ছিলেন তাঁরা এখন তাঁদের আদর্শকে মিছে-মিছি জলাঞ্জলি দিয়ে দুই নেত্রীর আঁচলের ছায়া মাড়ানোর চেষ্টা করছেন। দুই দলের প্রতিষ্ঠাতাগণ চিন্তা-চেতনায় ছিলেন ডান ঘরানার। কিন্তু বর্তমানের অবস্থা এতটাই করুণ যে বামের ঠেলায় স্ব স্ব দলের মূল চেতনাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। বামদের সুন্দর যুক্তিও প্রণিধানযোগ্য। এত লম্বা সময় ধরে দলে থাকার পরেও তারা কিভাবে বাম থাকে। কিন্তু তাঁরা কৌশলে তাঁদের আদর্শের অনেক কিছুই ঢুকিয়ে দিচ্ছে জাতীয় বিভিন্ন নীতিমালার মধ্যে। জ্বলন্ত প্রমাণ শিক্ষানীতি ও নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১। অন্যদিকে বিএনপির আমলে ধর্মীয় মূলবোধের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধা প্রদান ছিল বামদের একই ধরনের খেলা।
আওয়ামীলীগ ঢাক-ঢোল পিটে প্রচার করে দলটি সেক্যুলারেজমের ধারক ও বাহক। পক্ষান্তরে বিএনপি সেক্যুলার দল হলেও দেশের মানুষকে বোকা বানানোর জন্যে ঘুরে-ফিরে কথা বলে বুঝানোর চেষ্টা করে তারা ধর্মীয় মূলবোধে বিশ্বাসী। আওয়ামীলীগ সেক্যুলারেজমের আদর্শ ধারন করতে যে অক্ষম তা সংবিধান সংশোধন করতে গিয়ে তাদের নীতিগত অবস্থানের দোদুল্যমানতা তার প্রমাণ বহন করে। অপর দিকে বিএনপি ক্ষমতায় থেকে অথবা বাইরে থেকেও ধর্মীয় মূলবোধ রক্ষার্থে কিছুই করেনি। বিসমিল্লাহ্, আল্লাহর উপর আস্থা এবং রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে উভয় দলের মধ্যে চমৎকার মিল রয়েছে।
এক দল বাঙ্গালী এবং অন্য দল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী বলি আর কুরআন-সুন্নাহ্ বিরোধী আইন প্রণয়ন করবোনা বলি, জাতীয়তাবাদী হিসাবে দাবি করলে ধর্মীয় মূল্যবোধে এবং কুরআন-সুন্নাহর উপস্থাপিত চেতনার সাথে তা হবে সাংঘর্ষিক। কুরআন-সুন্নাহ্ জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে মত দেয়। কুরআনের আহবান পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য।
উভয় দলই ধর্মের নয়, ধর্মের নামে রাজনীতি করে। নির্বাচনের আগে কিছু কিছু তথাকথিত আলেমদেরকে সাথে রাখা এবং ইসলামী দলের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া, কোন পীরের মাজার থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করা, রাজনীতিকগণের দোয়ার জন্য মাথায় টুপি দেয়া ইত্যাদি ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগানো ছাড়া আর কিছুই না। দুই দলের লোক দেখানো ধর্মপ্রীতির ব্যাপারে আরো উদাহরণ দেয়া যাবে। রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগানোই হচ্ছে ধর্মের নামে রাজনীতি এবং উভয় দলই একাজে পারদর্শী।
আপাতদৃষ্টিতে বিএনপিকে ভারত বিরোধী মনে হলেও অতীতে দেশ পরিচালনার সময় ভারত তোষণ নীতি কারোর চোখকে ফাঁকি দিতে পারবেনা। আর এ ব্যাপারে আওয়ামীলীগের কথা না বলাই ভাল।
উরোক্ত বিষয়গুলি দিকে খেয়াল রাখলে যে কোন মানুষ সহজেই অনুমান করতে পারবে দল দুটির মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু একটাই আর তা হলো ক্ষমতার লড়াইয়ে দুই দল দুই মেরুতে অবস্থান নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধাচরণ করা।
দেশের অধিকাংশ মানুষের দুই দলের প্রতি সমর্থন থাকলেও তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, একথা স্বীকার করতেই হবে দুই দলের মাধ্যমে দেশে গুণগত কোন পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বিগত চল্লিশ বছরের কর্ম কান্ডই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যাদের নির্দিষ্ট কোন আদর্শ নেই তাদের কাছে ভাল কিছু আশা করা বাতুলতা ছাড়া আর কিছুই না। তাই সময় এসেছে দেশের স্বার্থে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের সন্ধানে নিজেদের বিবেক ও বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে সঠিক দল বেছে নেয়ার।
লেবেলসমূহ:
সাম্প্রতিক বিষয়
এর দ্বারা পোস্ট করা
suMon azaD (সুমন আজাদ)
র্যাব এর ক্রসফায়ারে লিমন পা হারালো। আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম তার কিছুদিন পর লিমন সন্ত্রাসী নয় এমন একটা ঘোষণা র্যাব প্রধান এবং পুলিশের কর্তা ব্যাক্তিরা দিলেন। কিন্তু তার কিছু দিন পরই গণেশ উল্টে গেলো! শুরু হলো লিমনকে সন্ত্রাসী বানানোর প্রক্রিয়া। এইচএসসি পরীক্ষার্থী লিমন পা হারিয়ে সন্ত্রাসীর তালিকায় চলে এলো রাতারাতি। আর এই বিষয়টা নিয়ে মেতে উঠলো সবাই। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ সবাই একটি বিষয় নিয়েই ভাবছে। তাহলে কি নিরপরাধ লিমন র্যাব এর কাছ থেকে রেহাই পাবে না? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, একটা মিথ্যাকে ডাকতে হয় শত মিথ্যার অবরণে। এখন র্যাব এরও হয়েছে একই অবস্থা। লিমনকে গুলি করে শত মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাদের অন্যায়কে ডাকতে হচ্ছে। রাষ্ঠ্র চাইলে যেকোনো সন্ত্রাসী কাজকে জায়েজ করতে পারে আবার ভাল কাজকে সন্ত্রাসী কাজ হিসেবে প্রতিস্থাপন করতে পারে। মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে একটি গণতান্ত্রিক সরকার কতটা নির্লজ্জ হতে পারে লিমন তার উৎকৃষ্ঠ উদাহরণ!
র্যাবের গুলিতে পা হারানো নিরীহ লিমনের জন্য সবাই ব্যথিত। আমরা সবাই চিন্তিত রাষ্ঠ্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে। সারা দেশবাসী হতভম্ব সরকারী নৈরাচার দেখে।
কিন্তু র্যাব এর কাজকে বৈধতা দেয়ার এই উদ্যোগ নতুন নয়। র্যাব তৈরি করাই হয়েছে বিনা বিচারে মানুষ হত্যার জন্য। আমাদের দেশে মানবাধিকারের কতটুকু চর্চা হয় তা লিমনের বিষয়টি বিবেচনায় আনলেই বোঝা যায়। যেখানে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান নিজে ফোন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বললেন যে, লিমন সুস্থ হওয়া পর্যন্ত যেনো হাসপাতাল তাকে ছেড়ে না দেয়, সেখানে পুলিশ এসে লিমনকে কিভাবে অসুস্থ অবস্থা কারাগারে নিয়ে যায়?
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে লিমন যদি সন্ত্রাসী হতো, যদি র্যাবের দাবী মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসী মোরশেদের সহযোগীই হতো কিংবা যদি সে মোরশেদই হতো তাহলে কি র্যাবের ক্রসফায়ার বৈধ হয়ে যেত? এই প্রশ্নটার মীমাংসা করা জরুরী কারণ মানুষ হত্যাকারী র্যাব কর্তৃক লিমনের পা হারানোর সাথে এর সম্পর্ক আছে। হত্যাকারীর একবার হত্যার নেশা পেয়ে গেলে সে হত্যা করতেই থাকে। র্যাব শুরু থেকেই তো মানুষ মারছে, পূর্ব বাংলা সর্বহরা পার্টি কিংবা অন্যান্য জনযুদ্ধের লাইনের নেতা-কর্মীদের মেরেছে, আমরা কিছু বলিনি। আজকে যে প্রথম আলো পত্রিকা লিমনের হয়ে দাঁড়িয়েছে সেও কিন্ত তখন র্যাবের সহোযোগী হিসেবে কাজ করেছে। একটার পর একটা চরমপন্থী সনাক্তকরণ অনুসন্ধানী রিপোর্ট ছেপেছে আর র্যাব তাদেরকে সাবাড় করেছে। আমরা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছি- যাক সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বাঁচা গেছে! র্যাব গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ছিচকে সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন লেবেল লাগিয়ে, কালা-ধলা-মুরগী ইত্যাদি নানান শব্দ জুড়ে দিয়ে দমনের রাজনীতি করেছে, আমরা খুশি হয়েছি কারণ আমাদের কাছে “সন্ত্রাসীর আবার মানবাধিকার কি?”
আমরা কি কখনও প্রশ্ন তুলেছি- আচ্ছা র্যাব যে এদেরকে সন্ত্রাসী বলে ক্রসফায়ার করে দিচ্ছে, এরা কি আসলেই সন্ত্রাসী?
নাকি কারো শ্রেনী ঘৃণা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রের শিকার? আমরা তো ধরেই নিয়েছি র্যাব মানে ফেরেস্তা বাহিনী, ফেরেস্তারা কখনো ভুল করতে পারে না! ব্যাক্তিগত-রাজনৈতিক-শ্রেণীগত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হতে পারে না। তাই আমরা কখনো প্রশ্ন তুলেনি, আচ্ছা এভাবে কি সন্ত্রাস নির্মূল করা যায়? বিষবৃক্ষের গোড়া অক্ষুণ্ন রেখে বার বার ডালপালা ছাটলে যে বিষবৃক্ষ মরে না, বরং নতুন নতুন শাখা প্রশাখা গজায় সে কথা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম।
কিন্তু আমরা কেন এমনটা ধরে নিলাম? কেন আমাদের মনে একটুও দ্বিধা কাজ করলো না? কেন আমরা একটু সন্দেহও পোষণ করলাম না? তবে কি আমরা যে কোন মূল্যে স্বস্তি পেতে চেয়েছিলাম? আমরা কি ধরে নিয়েছিলাম “যে কোন কিছুর মূল্য”টা সব সময়ই অন্য কেউ দেবে? আমাদেরকে কখনই দিতে হবে না?
আমি অনেককে দেখেছি র্যাবের অপরিহার্যতা নিয়ে কথা বলতে, আমি নিশ্চিত এখনও অনেককে পাওয়া যাবে, যারা মনে করেন “সন্ত্রাসীদেরকে ধরে ধরে মেরে ফেলাই সন্ত্রাস নির্মুলের শ্রেষ্ঠ ও কার্যকর উপায়” সেই সাথে তারা এও বলবে, যে র্যাব হাজার হাজার “সন্ত্রসী” নির্মুল করেছে তাদের একটু আধটু ভুল তো হতেই পারে সেটা নিয়ে এতো হইচই করার কি আছে! তারা কখনও প্রশ্ন তুলবে না মানুষ হত্যাকারী র্য্যাব কেন বরাবার দূর্বলের ঘরেই হানা দেয়, কেন কোন গডফাদার বা রথী মহারথিকে ক্রসফায়ার করা হয় না?
এই যে শেয়ার বাজারের সূচনীয় অবস্থা, হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হলো, ৬০ জনের কারসাজির কথা জানা যাচ্ছে, কই এদেরকে তো কখনও ক্রসফায়ার করা হবে না! হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট কারীদের এমনকি বিচারের আগে নাম না প্রকাশ করার কথা বলা হচ্ছে অথচ লাখ টাকার চাদাবাজদের ধরে নিয়ে ক্রসফায়ার করে দিয়ে সমাজ থেকে সন্ত্রাস নির্মুলের অভিনয় করা হচ্ছে! কি মজার ব্যাপার! আগুনে পুড়িয়ে শ্রমিক মারলে তো গার্মেন্টস মালিককে ক্রসফায়ারে দেয়া হয়না, দশট্রাক অস্ত্রমামলার ব্রিগেডিয়ার-কর্ণেল আসামীদেরও তো ক্রসফায়ার হতে দেখলাম না, দেশের তেলগ্যাস সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার নায়কদের তো ক্রসফায়ার হয় না! যদি সত্যিকার অর্থে সমাজ থেকে সন্ত্রাস-দূর্নীতি-লুটপাট নির্মূল করার উদ্দেশ্যেই র্যাব দিয়ে ক্রসফায়ার করানো হতো তাহলে তো শুরুতে বড় বড় গডফাদারদেরকে ক্রসফায়ার করাটাই স্বাভাবিক ছিল না? তা না করে, দেশের মধ্যে অস্ত্র কিংবা মাদক আমদানির মূল হোতাদের কে না ধরে, সীমান্তেই মাদক-অস্ত্র আসা বন্ধ না করে, ছোটখাটো অস্ত্রবাজ/মাদক ব্যাবসায়ীদের ক্রসফায়ার করা হলো, এতে সন্ত্রাস কতটা নির্মূল হলো?
নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্যকোনো উদ্দেশ্য?
আমরা বিষয়টাকে এভাবে দেখতে পারিঃ
১. অবাধ্য ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ছিচকে সন্ত্রাসীদেরকে কিছুটা ঠাণ্ডা করা
২. গ্রেফতার করে বিচার করলে নাটের গুরুদের নাম-পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ার যে ঝুঁকি থাকে, রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বের আসল চেহারা প্রকাশ হতে পারে, নাটের গুরুদেরকে সেই ঝুকি থেকে মুক্ত করা
৩. শাসক শ্রেণীর সন্ত্রাস দমনের নামে জনগনের কাছ থেকে বাহবা নেয়া
এক সময়ের বিপ্লবী রাজনীতির বাম সংগঠন তথা শ্রেণীশত্রু খতমের লাইনের সর্বহারা পার্টির নেতাকর্মীদের নির্মূল করার জন্য যে ক্রসফায়ার চালু করা হলো সে ক্রসফায়ার কি নিজেই “শ্রেণী শত্রু” খতমের লাইন না?
যার মাধ্যমে এলিট মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত সমাজে শান্তির সাথে বসবাস ও লুটপাট চালাতে পারে?
কোন সমাজে-রাষ্ট্রে সন্ত্রাস দুর্নীতি আকাশ থেকে পড়ে না, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে এর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। মানুষ মায়ের পেট থেকে সন্ত্রাসী হয়ে জন্ম নেয় না, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থাই তাকে সন্ত্রাসীতে পরিণত হতে বাধ্য করে। যে ব্যাবস্থা নাগরিকের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-কর্মসংস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা ইত্যাদির কোন দায়দায়িত্ব নেয় না, যে ব্যবস্থায় গুটি কয়েক মানুষ বেশির ভাগ মানুষের শ্রম শোষণ করে আরামে আয়েশে থাকে, যে ব্যবস্থায় আইন-কানুন-পুলিশ-প্রশাসন গুটি কয়েকের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে, যে ব্যবস্থায় পুঁজি যার মুল্লুক তার, সে ব্যবস্থা সন্ত্রাস দুর্নীতির জন্ম দেবেই। এই ব্যবস্থা বা সিস্টেমের প্রোডাক্ট/বাই প্রোডাক্ট “সন্ত্রাস-দুর্নীতি”।
এমনিতে ব্যবস্থার নাটের গুরুদের জন্য কোন সমস্যা না যতদিন না সেটা তাদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেলে সেটার জন্য তো একটা রেডিমেড ব্যবস্থা থাকা লাগে: র্যাবের ক্রসফায়ার হলো সেই রকমই একটা ব্যবস্থা। সন্ত্রাস-দূর্নীতিতে জনগন অতিষ্ঠ হয়ে গোটা সিস্টেমটাকে যেন টালমাটাল করে না দেয় তার জন্য সিস্টেমরই একটা রক্ষা কবচ এই ক্রসফায়ার সিস্টেম। আমরা যতদিন এই সত্যটা বুঝে সত্যিকার অর্থে র্যাব ও তার ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে রুখে না দাড়াবো, ততদিনই “যে কোন মূল্যে” তথাকথিত সন্ত্রাসী দমন চলবে। এর আগে এই “যেকোন মূল্য” সর্বহারা মোফাক্খারুল-টুটুলরা দিয়েছে, এখন দিচ্ছে নিরীহ দিনমজুর লিমনরা, কিন্তু একদিন সাহিত্যিক-লেখক-ভিন্নমতাবলম্বীরা, সুশীল সমাজের ধারকরা, নিরাপদে থাকা কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীসহ গোটা দেশের মানুষকে এর চরম মূল্য দিতে হবে। এই ক্রসফায়ারে বিনা বিচারে হত্যার যে রীতি প্রচলিত হয়েছে তার মূল্য দিতে হবে সবাইকে। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ক্রসফায়ার সিস্টেমের সমালোচনা করে বলেছিলেন, “প্রকৃতি অতি যত্ন নিয়ে একটি মানব সন্তানকে জন্ম দেয়। অনেকটা সময় নিয়ে এই প্রকৃয়া চলে। হঠাৎ করে বিনা বিচারে কাউকে মেরে ফেলা কোনো সিস্টেম হতে পারে না।“ আজ আমাদের লিমনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সচেতন হওয়া উচিৎ। এখনই যদি সচেতন না হই তাহলে বিনা বিচারে হত্যার এই প্রকৃয়া “ক্রসফায়ার” এর জন্য একদিন চরম মূল্য দিতে হবে জাতিকে।
র্যাবের গুলিতে পা হারানো নিরীহ লিমনের জন্য সবাই ব্যথিত। আমরা সবাই চিন্তিত রাষ্ঠ্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে। সারা দেশবাসী হতভম্ব সরকারী নৈরাচার দেখে।
কিন্তু র্যাব এর কাজকে বৈধতা দেয়ার এই উদ্যোগ নতুন নয়। র্যাব তৈরি করাই হয়েছে বিনা বিচারে মানুষ হত্যার জন্য। আমাদের দেশে মানবাধিকারের কতটুকু চর্চা হয় তা লিমনের বিষয়টি বিবেচনায় আনলেই বোঝা যায়। যেখানে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান নিজে ফোন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বললেন যে, লিমন সুস্থ হওয়া পর্যন্ত যেনো হাসপাতাল তাকে ছেড়ে না দেয়, সেখানে পুলিশ এসে লিমনকে কিভাবে অসুস্থ অবস্থা কারাগারে নিয়ে যায়?
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে লিমন যদি সন্ত্রাসী হতো, যদি র্যাবের দাবী মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসী মোরশেদের সহযোগীই হতো কিংবা যদি সে মোরশেদই হতো তাহলে কি র্যাবের ক্রসফায়ার বৈধ হয়ে যেত? এই প্রশ্নটার মীমাংসা করা জরুরী কারণ মানুষ হত্যাকারী র্যাব কর্তৃক লিমনের পা হারানোর সাথে এর সম্পর্ক আছে। হত্যাকারীর একবার হত্যার নেশা পেয়ে গেলে সে হত্যা করতেই থাকে। র্যাব শুরু থেকেই তো মানুষ মারছে, পূর্ব বাংলা সর্বহরা পার্টি কিংবা অন্যান্য জনযুদ্ধের লাইনের নেতা-কর্মীদের মেরেছে, আমরা কিছু বলিনি। আজকে যে প্রথম আলো পত্রিকা লিমনের হয়ে দাঁড়িয়েছে সেও কিন্ত তখন র্যাবের সহোযোগী হিসেবে কাজ করেছে। একটার পর একটা চরমপন্থী সনাক্তকরণ অনুসন্ধানী রিপোর্ট ছেপেছে আর র্যাব তাদেরকে সাবাড় করেছে। আমরা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছি- যাক সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বাঁচা গেছে! র্যাব গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ছিচকে সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন লেবেল লাগিয়ে, কালা-ধলা-মুরগী ইত্যাদি নানান শব্দ জুড়ে দিয়ে দমনের রাজনীতি করেছে, আমরা খুশি হয়েছি কারণ আমাদের কাছে “সন্ত্রাসীর আবার মানবাধিকার কি?”
আমরা কি কখনও প্রশ্ন তুলেছি- আচ্ছা র্যাব যে এদেরকে সন্ত্রাসী বলে ক্রসফায়ার করে দিচ্ছে, এরা কি আসলেই সন্ত্রাসী?
নাকি কারো শ্রেনী ঘৃণা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রের শিকার? আমরা তো ধরেই নিয়েছি র্যাব মানে ফেরেস্তা বাহিনী, ফেরেস্তারা কখনো ভুল করতে পারে না! ব্যাক্তিগত-রাজনৈতিক-শ্রেণীগত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হতে পারে না। তাই আমরা কখনো প্রশ্ন তুলেনি, আচ্ছা এভাবে কি সন্ত্রাস নির্মূল করা যায়? বিষবৃক্ষের গোড়া অক্ষুণ্ন রেখে বার বার ডালপালা ছাটলে যে বিষবৃক্ষ মরে না, বরং নতুন নতুন শাখা প্রশাখা গজায় সে কথা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম।
কিন্তু আমরা কেন এমনটা ধরে নিলাম? কেন আমাদের মনে একটুও দ্বিধা কাজ করলো না? কেন আমরা একটু সন্দেহও পোষণ করলাম না? তবে কি আমরা যে কোন মূল্যে স্বস্তি পেতে চেয়েছিলাম? আমরা কি ধরে নিয়েছিলাম “যে কোন কিছুর মূল্য”টা সব সময়ই অন্য কেউ দেবে? আমাদেরকে কখনই দিতে হবে না?
আমি অনেককে দেখেছি র্যাবের অপরিহার্যতা নিয়ে কথা বলতে, আমি নিশ্চিত এখনও অনেককে পাওয়া যাবে, যারা মনে করেন “সন্ত্রাসীদেরকে ধরে ধরে মেরে ফেলাই সন্ত্রাস নির্মুলের শ্রেষ্ঠ ও কার্যকর উপায়” সেই সাথে তারা এও বলবে, যে র্যাব হাজার হাজার “সন্ত্রসী” নির্মুল করেছে তাদের একটু আধটু ভুল তো হতেই পারে সেটা নিয়ে এতো হইচই করার কি আছে! তারা কখনও প্রশ্ন তুলবে না মানুষ হত্যাকারী র্য্যাব কেন বরাবার দূর্বলের ঘরেই হানা দেয়, কেন কোন গডফাদার বা রথী মহারথিকে ক্রসফায়ার করা হয় না?
এই যে শেয়ার বাজারের সূচনীয় অবস্থা, হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হলো, ৬০ জনের কারসাজির কথা জানা যাচ্ছে, কই এদেরকে তো কখনও ক্রসফায়ার করা হবে না! হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট কারীদের এমনকি বিচারের আগে নাম না প্রকাশ করার কথা বলা হচ্ছে অথচ লাখ টাকার চাদাবাজদের ধরে নিয়ে ক্রসফায়ার করে দিয়ে সমাজ থেকে সন্ত্রাস নির্মুলের অভিনয় করা হচ্ছে! কি মজার ব্যাপার! আগুনে পুড়িয়ে শ্রমিক মারলে তো গার্মেন্টস মালিককে ক্রসফায়ারে দেয়া হয়না, দশট্রাক অস্ত্রমামলার ব্রিগেডিয়ার-কর্ণেল আসামীদেরও তো ক্রসফায়ার হতে দেখলাম না, দেশের তেলগ্যাস সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার নায়কদের তো ক্রসফায়ার হয় না! যদি সত্যিকার অর্থে সমাজ থেকে সন্ত্রাস-দূর্নীতি-লুটপাট নির্মূল করার উদ্দেশ্যেই র্যাব দিয়ে ক্রসফায়ার করানো হতো তাহলে তো শুরুতে বড় বড় গডফাদারদেরকে ক্রসফায়ার করাটাই স্বাভাবিক ছিল না? তা না করে, দেশের মধ্যে অস্ত্র কিংবা মাদক আমদানির মূল হোতাদের কে না ধরে, সীমান্তেই মাদক-অস্ত্র আসা বন্ধ না করে, ছোটখাটো অস্ত্রবাজ/মাদক ব্যাবসায়ীদের ক্রসফায়ার করা হলো, এতে সন্ত্রাস কতটা নির্মূল হলো?
নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্যকোনো উদ্দেশ্য?
আমরা বিষয়টাকে এভাবে দেখতে পারিঃ
১. অবাধ্য ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ছিচকে সন্ত্রাসীদেরকে কিছুটা ঠাণ্ডা করা
২. গ্রেফতার করে বিচার করলে নাটের গুরুদের নাম-পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ার যে ঝুঁকি থাকে, রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বের আসল চেহারা প্রকাশ হতে পারে, নাটের গুরুদেরকে সেই ঝুকি থেকে মুক্ত করা
৩. শাসক শ্রেণীর সন্ত্রাস দমনের নামে জনগনের কাছ থেকে বাহবা নেয়া
এক সময়ের বিপ্লবী রাজনীতির বাম সংগঠন তথা শ্রেণীশত্রু খতমের লাইনের সর্বহারা পার্টির নেতাকর্মীদের নির্মূল করার জন্য যে ক্রসফায়ার চালু করা হলো সে ক্রসফায়ার কি নিজেই “শ্রেণী শত্রু” খতমের লাইন না?
যার মাধ্যমে এলিট মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত সমাজে শান্তির সাথে বসবাস ও লুটপাট চালাতে পারে?
কোন সমাজে-রাষ্ট্রে সন্ত্রাস দুর্নীতি আকাশ থেকে পড়ে না, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে এর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। মানুষ মায়ের পেট থেকে সন্ত্রাসী হয়ে জন্ম নেয় না, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থাই তাকে সন্ত্রাসীতে পরিণত হতে বাধ্য করে। যে ব্যাবস্থা নাগরিকের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-কর্মসংস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা ইত্যাদির কোন দায়দায়িত্ব নেয় না, যে ব্যবস্থায় গুটি কয়েক মানুষ বেশির ভাগ মানুষের শ্রম শোষণ করে আরামে আয়েশে থাকে, যে ব্যবস্থায় আইন-কানুন-পুলিশ-প্রশাসন গুটি কয়েকের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে, যে ব্যবস্থায় পুঁজি যার মুল্লুক তার, সে ব্যবস্থা সন্ত্রাস দুর্নীতির জন্ম দেবেই। এই ব্যবস্থা বা সিস্টেমের প্রোডাক্ট/বাই প্রোডাক্ট “সন্ত্রাস-দুর্নীতি”।
এমনিতে ব্যবস্থার নাটের গুরুদের জন্য কোন সমস্যা না যতদিন না সেটা তাদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেলে সেটার জন্য তো একটা রেডিমেড ব্যবস্থা থাকা লাগে: র্যাবের ক্রসফায়ার হলো সেই রকমই একটা ব্যবস্থা। সন্ত্রাস-দূর্নীতিতে জনগন অতিষ্ঠ হয়ে গোটা সিস্টেমটাকে যেন টালমাটাল করে না দেয় তার জন্য সিস্টেমরই একটা রক্ষা কবচ এই ক্রসফায়ার সিস্টেম। আমরা যতদিন এই সত্যটা বুঝে সত্যিকার অর্থে র্যাব ও তার ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে রুখে না দাড়াবো, ততদিনই “যে কোন মূল্যে” তথাকথিত সন্ত্রাসী দমন চলবে। এর আগে এই “যেকোন মূল্য” সর্বহারা মোফাক্খারুল-টুটুলরা দিয়েছে, এখন দিচ্ছে নিরীহ দিনমজুর লিমনরা, কিন্তু একদিন সাহিত্যিক-লেখক-ভিন্নমতাবলম্বীরা, সুশীল সমাজের ধারকরা, নিরাপদে থাকা কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীসহ গোটা দেশের মানুষকে এর চরম মূল্য দিতে হবে। এই ক্রসফায়ারে বিনা বিচারে হত্যার যে রীতি প্রচলিত হয়েছে তার মূল্য দিতে হবে সবাইকে। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ক্রসফায়ার সিস্টেমের সমালোচনা করে বলেছিলেন, “প্রকৃতি অতি যত্ন নিয়ে একটি মানব সন্তানকে জন্ম দেয়। অনেকটা সময় নিয়ে এই প্রকৃয়া চলে। হঠাৎ করে বিনা বিচারে কাউকে মেরে ফেলা কোনো সিস্টেম হতে পারে না।“ আজ আমাদের লিমনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সচেতন হওয়া উচিৎ। এখনই যদি সচেতন না হই তাহলে বিনা বিচারে হত্যার এই প্রকৃয়া “ক্রসফায়ার” এর জন্য একদিন চরম মূল্য দিতে হবে জাতিকে।
লেবেলসমূহ:
সাম্প্রতিক বিষয়


.jpg)