পৃষ্ঠাসমূহ

দেহাত্ববোধক কবিতা


আদমশুমারী

শহরের মত
গাঁয়ের মেয়েরাও যায় পার্লারে
মেক-আপ করে ও করায়
তারপর সম্ভ্রান্ত পথে হেঁটে
ঘেমে ও ঘামিয়ে প্রথাগত হয়ে যায়।

আমরা তারও হিসাব রাখি!

হেডম্যান

বিরাট অসঙ্গতির পর_
তুমি যাকে হেডম্যান নামে ডাকতে
দেখলে_ প্রকৃতিজুড়ে সন্ধ্যা হলে
তারও মাথা নত হয়_
প্রথাগত ঝিলের কাছাকাছি।

হাতঘড়ি

হাতকে ধরে থাকা ঘড়ি
নারীকে ধরে থাকা শাড়ী
_দুটো এক নয়।
তবুও দেখো_
প্রয়োজনে দুটোকেই খুলতে হয়।

সেলাইমেশিন

সেলাইমেশিন সর্বদাই রহঃ সহঃ নীতিতে বিশ্বাসী।

গতবারের সেলাই শেষে
দর্জি তার মজুরি পেল এ বছর।

ক্যালকুলেটর

মুদিঅলা আঙুলের কাজ ভাল পারে
মাস শেষে হিসাবের খাতা যায় গৃহিনীর ঘরে।

হ্যান্ডিক্রাফ্ট

অনেকণ তাকিয়ে ছিলাম জলের দিকে
জল; না-না তার আধারের দিকে
ভিজব ভিজব করছি অথবা ভাবছি_
তখন আধার বাধা দিল।
সেই থেকে বাঁধা পড়েছি নিজ বাহুডোরে
ভিজি এবং ভিজাই কিন্তু জলে নামি না।

প্রজনন

অন্ধকার বাণিজ্য করছে
আদিমতা কিনে নিয়ে
বিক্রি দিচ্ছে শৈলপাঠ।
আমরা অত্যন্ত যত্নে
নিজেদের নাম খোদাই করছি।

সব প্রস্তুতি ও আয়োজন শেষে
যখন কাজ সেই সময়ের মত শেষ হয়

প্রাণিবিদ্যার প্রজনন চ্যাপ্টার মোতাবেক
(সামাজিক দলিল ও লোকচুর সাীর ঝামেলা পেরিয়ে)
পাঠ নিতে শিখি গৃহস্থালী জীবনের।
সেখানে, লবণাক্ততার পর্ব শেষে
অপোকে দশ মাসের স্থায়িত্বে পৌঁছানোর কান্ত মুর্হুতে_
মুখ থাকে চিবুকের পাশে।
আর প্রজনণের হাতিয়ারটা আপাতত বিশ্রামে যায়।

দৌড়

আটতলা বিল্ডিং থেকে একবার
প্যান্থারের প্যাকেট নিচে পড়েছিল,
দেখে ভেবেছিলাম;
প্যান্থারেরা এত উপড়ে উঠে যায়!
আজ ষোলতালা থেকে নামতে নামতে ভাবছি
প্যান্থারেরা কত নিচে থাকে!

সংপ্তি কার্য বিবরণী

শাস্ত্র মতে, বিড়াল মারার রাতে
দ্বি-পয়ি চুক্তিতেই দীর্ঘ হয় রাত।
কম্পিত করতলে আগামীর স্বপ্ন রেখে
স্বপ্নমাখা হাত তখন সরিয়ে নেয়_
এক একটি পৃথক বিভাগের
বিভিন্ন বয়সে প্রাপ্ত_ বাঁধাসমূহকে।

তারপর খাটের একটা পরীা চলে
ঝড়-তোফানে টিকবে কেমন!

স্বপ্নে, মৎস্যকন্যা

স্বপ্নে কেবল নৌকাবাইচ
মাঝ রাতের নবজাতক ঘুম
দৃশ্য সপে দেয় মাঝির হাতে
মাঝি দেখে_
নদী জুড়ে জলীয় শ্যাওলা
তার ফাঁকে কয়েকটি মাছ।
মাছেদের প্রসঙ্গ এলে_বিবিধ প্রসঙ্গ আসে।

লোকাচার

পাতালপথ পাতালেই থাকা স্বাভাবিক
এই স্বাভাবিকতার সাথে প্রশ্নচিহৃ যোগ করে
আমরা তারও লিঙ্গান্তর ঘটাই।

ঘটিয়ে, ঘরে_ ঘরের বাহিরে
বাস্তবস্বপ্নে কত কী ভাবি!

ছায়ানৃত্য

পুরুষ মানুষ আজকাল ভেজা বেড়ালের মত
মাছটি উল্টিয়ে খাওয়ার সূত্র
উল্টিয়ে দিয়েছে। আমি এই কথা
তোমার ডানের রমণীয় কানে বলতেই তুমি
ডান হাতটা আমার এক ঝটকায় সরিয়ে দিলে_
কোমরের ফিতা থেকে।
রিঙ্াওয়ালা কিছু না বুঝে গান ধরে_
_ লোকে বলে আমার ঘরে নাকি...
আমি কি আর বসে থাকতে পারি?
হাতগুলোর সাথে সাথে ঠোঁটগুলোও এবার_
ব্যস্ত হয়ে রিঙ্ায় বসেই দেখল
পাশের রাস্তায় পাশাপাশি যাচ্ছে কি অদ্ভূত ছায়ানৃত্য

সিলেবাস

লাল কালি দিয়ে লেখা প্রথম অধ্যায়ের জন্যই
শিক-শিকিা বিরতি দিলেন প্রায়
তিনোধিক দিন।
শষ্যের মৌসুম এক সময় আসবেই...

শিক-শিকিা, ছাত্র এবং ছাত্রীকে
ব্যবহারিক ও তাত্তি্বক মিলিয়ে
সৃষ্টিতত্ত্বের সাধারণ নিয়মে
পাঠ শিখালেন অ, আ থেকে ঐ আহ্ পর্যন্ত।

পাঠ শেষে অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে
আগামীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে দুজনই
পড়ে গেলেন ধাঁধায়!

স্বপ্ন বিষয়ক জটিলতা

এমনও হয়!
মাঝরাতে নিদ্রাদেবীর কোল থেকে নেমে
তাকেই কোলের উপর বসাতে হয়।
বেশী কিছু না হলেও অর্প কিছু হয়!
তারপর দিনের শুরুতে শাওয়ারের নীচে
ভালো সময় দাঁড়াতে হয়!

জলীয় আলপনা

দেহের পসারী নিয়ে মাদুরে বসে
সরু চোখে দেখা পাশের জ্বলন্ত মানবী।

পদযুগলের দূরত্বহীন স্থানে
কত হয়েছে আনাগোনা।
রক্তের দসু্যতার কাছে হার মেনে; উতলা নদীতে
দ্রুতলয়ে টেনেছ বৈঠা।
শেষে, লবণাক্ত শরীর নিয়ে
ঢলে পড়েছ রহস্যঘেরা তীরে।

মাংসল ভূমিতে আঁকলে বুঝি জলীয় আলপনা!


সাময়িক বিরতি

চাষিতে আমি চাই যে ভূমি
চাষ বড় প্রয়োজন!
অনাবাদি! না থাকতে দেয়া যায় না
ভূমিই যে করে এমন আকর্ষণ!

চাষাবাদের ষোলকলা জানি আমি
আমি? আমি এখন অভিজ্ঞ চাষী।
লাঙ্গল জোয়াল নিয়ে ঝাপিয়ে পড়তেই
ভূমি বলে_ এখন মৌসুমের ক্রান্তিকাল
রহঃ রহ কিছুটা সময়, আগামী পরশু কাল!

সন্ধি

ভাদ্রমাসের লালনায় উত্তপ্ত শীতকাল
কানামাচির নিম্নাঙ্গের পট্টি উড়িয়ে
শরতের কাশবন উদ্ভোধন।

আহাঃ পাহাড়ি পথে এগোতে গিয়ে
শীতকালেও শ্বেদজল গড়িয়ে পড়ে- অহেতুক
ষড়ঋৃতুর দেশে নবীন পর্যটকের আর্বিভাব নিশ্চিত করে_
ঋৃতু বৈচিত্র ভুলে যাওয়া।

৩৬-২৪-৩৬

সাবালক হাতের দসু্যতায়
দুলতে থাকে জোড়া টুপির নিয়ন্ত্রিত জিনিসগুলো।
চলমানতার সূত্র মুখস্থ করে
পিটুইটারী গ্রন্থির ঈশারায়
হাত ছুটতে থাকে এক অচেনা শহরে।
শহরের গলির নাম্বার বড় অদ্ভুত!
ছত্রিশ থেকে শুরু হয়ে বার কমে
আবার পূর্বের নাম্বারে যায়।

৭-সতেরো : একটি ভিন্ন-ভাবনার কাগজ

৭-সতেরো : একটি ভিন্ন-ভাবনার কাগজ



"ভিন্ন ভাবনার প্রকাশ কিংবা ভাবনার ভিন্ন প্রকাশ"। এটাই এর মূল আলোচ্য বিষয়। কাজ করতে
চায় শিল্প-সাহিত্যের বৈচিত্র নিয়ে। বৈচিত্রময় সাহিত্যের প্রতিটি আঙিনায় অংশ নেবে কৌতুহলের দৃষ্টি নিয়ে।
এবারের কৌতুহলের বিষয় হচ্ছে, 'হবিগঞ্জের শিল্প-সাহিত্যাঙ্গন'। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গবেষণা, প্রবন্ধ, নাটক, শিশু-সাহিত্য, চলচিত্র, চারুশিল্প, সাহিত্য কাগজ সম্পাদনাসহ শিল্পের সকল শাখায় কাজ করছেন হবিগঞ্জের শিল্পের উত্তরসাধকগণ। এ সকল বিষয়ের আঁতুড়কথন জানতে এবং পাঠকদের জানাতে আগ্রহী। তাই এবারের বিষয়টি সাজানো হয়েছে_ "সৃজনশীলতার আঁতুড়কথন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ" শিরোনামে।
আশা করছি এর এই আয়োজনে আপনি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে উদ্যোগটি বাস্তবায়নে অংশ নেবেন।

কী নিয়ে লিখবেন? সম্পাদনায়
তানসেন আমীন
সুমন আজাদ

# কাজের বিষয় হিসেবে উক্ত বিষয়টিকে নির্বাচন করার কারণ
# নিজস্ব কাজের ত্রে নিয়ে আপনার মূল্যায়ন ও অভিজ্ঞতা

এছাড়াও এর আয়তনের ব্যাপারে সচেতন থেকে আপনি আপনার ইচ্ছে মতো যে কোন বিষয়ে লিখতে পারেন। প্রাসঙ্গিক আলোচনার েেত্র আপনার মন্তব্য/বক্তব্য/দৃষ্টিভঙ্গির কথা আমরা আগ্রহ নিয়ে ছাপব।

এর আমন্ত্রণে যে সকল লেখক নির্বাচিত বিষয় নিয়ে "সৃজনশীলতার আঁতুড়কথন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ" শিরোনামে লিখবেন বলে আশা করা যাচ্ছে, তাঁরা হলেন ঃ

গবেষণাঃ ভাষা আন্দোলনে হবিগঞ্জ : তরফদার মুহাম্মদ ইসমাইল
প্রবন্ধঃ মাটি ও মানুষের মানচিত্র : এম এ রব
শিশু-সাহিত্যঃ বাঘ মামার মেয়ের বিয়ে : জাহান আরা খাতুন
উপন্যাসঃ স্বপ্ন দ্রোহ ভালোবাসা : পারভেজ চৌধুরী
সম্পাদনাঃ জন-প্রবাদ : আবু সালেহ আহমদ
নাটকঃ বিভাজন : রুমা মোদক
কবিতাঃ জোছনা ধরে রাতের হাত : অপু চৌধুরী
চলচিত্রঃ গণমানুষের মরমিয়া কবি : শাহ্ আবদুল করিম ও সিদ্দিকী হারুন
গল্পঃ পূর্ণিমা অথবা ফণিমনসা : সাইফুর রহমান কায়েস
চারুশিল্পঃ নির্বাচিত চিত্রকর্ম : রণবীর পাল


* মনোনীত কাজ (লেখা/বই/পাণ্ডুলিপি/পত্রিকা/ভিডিও/চিত্রকর্ম)- এর একটি কপি জমা দিতে হবে।
* লেখা অনুধর্্ব ৮০০ (আটশ) শব্দের মধ্যে হতে হবে।

বাজল সানাঁই || একটি বিয়ে স্মরণিকা






উড়ণচণ্ডি

উড়ণচণ্ডি/সুমন আজাদ

স্বপ্ন ডিঙিয়ে অবাক পতন পৃথিবীর বুকে...

আমি রাজপুত্র নই; অলস ভিখিরি
ভিার পাত্রে প্রতি রাতে এক নারী
রেখে যায় খোলে_
তার নিজস্ব সভ্যতা; তার ইতিউতি
আমি কি আর ও-সব বুঝি!
অবুঝ পুরুষ হয়ে রেখে দিই
পাঁজড়ের পাশে তার সব স্মৃতি।

ভাবনা-গদ্য অথবা কবিতার পক্ষে

আজকের কবিকে তাঁর নিজের উদ্দেশ্য ও কবিতার উদ্দেশ্য আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হয়। সে কবিতাকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করে কোথাও পৌঁছুতে চায় কি-না; এই প্রশ্নের মীমাংসা শুরুতেই করে নিতে হয়। অপর দিকে কেনো এবং কার জন্য লিখবে তা-ও নির্দিষ্ট করা জরুরি। কেননা, বাংলা কবিতা আজ এমন এক স্থানে পৌঁছেছে, যেখান থেকে সে কোনো অযাচিত কবি ও কবিতাকে তাঁর ছায়াতলে স্থান দিতে বাধ্য নয়। তবে, মিডিয়ার জন্য আজ এ ধরণের কবি ও কবিতা উভয়েরই গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আমি এই 'গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে' সমপ্রদায়টাকে শ্রদ্ধার সাথে আলোচনা থেকে বিরত রেখে বাদবাকী কথাগুলো বলছি।
বাংলা কবিতায় বহু কবি তাঁদের যোগ্যতার স্বার রাখছেন এবং রেখে গেছেন। সেখানে যদি আর কোন প্রথাগত নতুন কবি, কবিতা না লেখেন; তবে মনে হয় না যে, বাংলা কবিতা অথবা বিশ্ব কবিতার খুব বেশী একটা তি হবে। আবার বছরের পর বছর ধরেও যদি কোন নবীন কবির স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর চিহ্নিত না হয়, তাহলেও নিশ্চয়ই খুব একটা আফসোস থাকবে না। কারণ, চর্যাপদের মাঠ পেরিয়ে বাংলা কবিতাকে দু'শ বছরের অনাবাদি জমিন পাড়ি দিতে হয়েছে।
তারপর মঙ্গল>মধুসূদন>রবীন্দ্র যুগ পেরিয়ে পঞ্চপাণ্ডবদের বিসতৃতি। সংেেপ তাই বলা যায়, বাংলা কবিতা তাঁর প্রধান কণ্ঠস্বরের জন্য অপো করতে জানে। শুধু মিডিয়ার দৌরাত্নে আমরাই অপো করতে ভুলে গেছি। প্রাপ্তির আকাঙ্খায় নিজের সৃজনশীলতায় কৃত্রিম 'তা' দিয়ে রাতারাতি ফুঁটিয়ে তুলছি আকাঙ্খার ডিম। অথচ বেমালুম ভুলে যাই_ সাহিত্যে প্রাপ্তি ও মূল্যায়ন সাধারণত একই সাথে হয় না। তবুও কেউ জনপ্রিয় বা বহুলপঠিত হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করলে তাকে এই সত্য মাথায় রাখতে হবে যে, 'সত্যিকারের গভীর জীবনবোধ সম্পন্ন উঁচুমানের মননশীল বই সাধারণত পাঠকপ্রিয় হয় না। সাধারণ পাঠকরা সেসব বইয়ের নাম জানেন, দূর থেকে শ্রদ্ধা করেন কিন্তু মননে কিংবা হৃদয়ে ধারণ করতে পারেন না।'
(ভুমিকাঃ দৃষ্টিপাত/নাহিদ আহসান)
এটা অবশ্য সাধারণ পাঠকদের দোষ নয়, বরং এটাই স্বাভাবিক। সমাজের সব মানুষ যে সূ্ন অনুভূতি নিয়ে জন্মায় না; এই কথাটা রূঢ় হলেও সত্য। আর এই সত্যে বিশ্বাস রাখেন এমন পাঠক যেমন রয়েছেন, সাহিত্যিকও আছেন। সাহিত্য জগতে কোনো কোনো লেখক বিশেষ কোন শ্রেণীর পাঠকের অতিরিক্ত মনোযোগ দাবি করতেই পারেন। সেই লেখক যদি আজীবন এই একইভাবে বিশেষ শ্রেণীর পাঠকের অতিরিক্ত মনোযোগ দাবি করে সাধারণের কাছে দুবের্াধ্য রয়ে যান; সেজন্য ঐ লেখককে সাধারণের অপঠিত বলে মূল্যায়নে কারপন্ন করলে চলবে না। তবে, যাঁরা স্বভাবতই চিন্তাশীল, আত্নমগ্ন, কবি, তাঁরা চিরকালই নিঃসঙ্গ। তাঁরা অপ্রাপ্তির একটা ধারাবাহিক বঞ্চনা ভোগ করে যান জীবিতাবস্থায়। আর এইসব লেখককেই ধারণ করে লিটলম্যাগ। লিটলম্যাগের কণ্ঠ তাই চীরকাল-ই বিদ্রোহী।
খুব সম্ভবত, সচেতনভাবে এই বিদ্রোহী কণ্ঠের কোরাস বেঁজে উঠেছিল কল্লোলযুগে। কল্লোলে প্রকাশিত, 'রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক' প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, 'বাংলা ভাষায় কবিতা লেখার কাজটি তিনি (রবীন্দ্রনাথ) অনেক বেশী কঠিন করে দিয়েছেন। একজনের বেশী রবীন্দ্রনাথ সম্ভব নয়; তার পরে কবিতা লিখতে হলে এমন কাজ বেছে নিতে হবে যে কাজ তিনি করেন নি; তুলনায় ুদ্র হলে_ হবারই সম্ভাবনা_ তাই নিয়েই তৃপ্ত থাকা চাই।" মধ্যযুগীয় অনাত্ন আবহকে অস্বীকার করে মধুসূদন দত্ত যেটুকু অগ্রসর হয়েছিলেন, তার তুলনায় তাঁর-ই আবহকে প্রেরণা হিসেবে নিয়ে মধুসূদনকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর অতিক্রমণের ধারায় কল্লোলযুগের উচ্চারণ ছিল, 'অন্ধভক্তির উপর আমাদের আর আস্থা নেই; আমরা বিশ্বাস করতে শিখেছি বিজ্ঞানকে। ভগবান, ভূত ও ভালবাসা_ এ তিনটি জিনিসের উপর আমাদের প্রাক্তন বিশ্বাস আমরা হারিয়েছি।'
(বু:ব/অতি আধুনিক বাংলা সাহিত্য)
এই অস্বীকার প্রবনতার ফলে তিরিশের যে কবিতাবিপ্লব তার ধারাবাহিকতাকে গ্রহণ করে চলমান সময় পর্যন্ত এর চর্চা অব্যাহত রয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠিত চেতনাকে অতিক্রম না করে কোন ভাষাতেই নতুন ধারার সূত্রপাত ঘটেনি। তবে, প্রতিষ্ঠিত চেতনাকে অতিক্রম করতে হলে কবিদের প্রথমত আত্নসত্তার প্রতিষ্ঠা তথা নিজস্ব স্বকীয়তার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হয়।

আমার বিশ্বাস, কবিতা হচ্ছে সৃষ্টি ও নির্মাণ_ এই দু'য়ের সমন্বয়। কবিতা তৈরী হবে যুক্তি ও যাদুর সমন্বয়ে, এর শব্দ ব্যবহার প্রচলিত অর্থকে ধারণ করে কবিতাকে করে তুলবে ব্যঞ্জনাময়। কবিতার শব্দরা এক একটি অরচিত্র হয়ে

পাঠকের কাছে ক্রমাগত পৌঁছে দেবে সংকেতের পর সংকেত। সংকেত ও ইঙ্গিতের যৌথ বির্নিমাণে সৃষ্টি হবে কবিতা। এক এক সময় মনে হয় মিশেল ফুকো'র কথাটাই বুঝি সত্যি_ 'কবিতার পাঠান্তর ও জটিল বির্নিমাণের দ্বারা শিল্পের গোপন, লোকায়ত অবতল স্পর্শ করা যায়।'
এটা তো সর্বজনবিধিত যে, প্রত্যেক কবির কবিতায় ইনটুনেশন (নিজস্ব স্বরায়ন) প্রয়োজন। একে চিহ্নিত করা হয়তো সময়ের কাজ কিন্তু শুরুর প্রবণতা থাকা উচিৎ লেখকের মধ্যে। যদি পুরনো পথেই হেঁটে গেলাম, যদি অন্যের স্বরে কথা বললাম, অন্যের চোখে বিশ্ব দেখলাম_ তাহলে সেই বহুলচর্চিত অভিজ্ঞতা বয়ানের কি প্রয়োজন? তবে এ-ও হয়তো ঠিক নয় যে, স্বাতন্ত্রতা প্রকাশ পেলেই বড় মাপের কোন কিছু হয়ে যাওয়া যাবে!
কিন্তু এটাকে গন্তব্যে পৌঁছার সঠিক রাস্তায় হিসেবী পদপে হিসেবে নিশ্চয়ই চিহ্নিত করা যায়।

মুঠোফোনের এই যুগে কবিরা প্রতিনিয়ত পরিচিত হচ্ছেন অত্যাধুনিক আবিস্কারের সাথে। দ্রুতগতির যুগে সব কিছু বদলে যাচ্ছে দ্রুত। দৃষ্টিগোচর হচ্ছে সামাজিক পরিবর্তন। এখন মানুষ সব কিছুতেই ওই বিষয়টার নিযর্াস চায়। দিনদিন মানুষের ডিটেইলস এর প্রতি অমনোযোগিতা কিংবা অনাগ্রহ_ সাহিত্যেও প্রভাব ফেলছে। এর ফলশ্রুতিতে সাহিত্য বাজারে অণু'র আর্বিভাব। তবে এই পরিবর্তনের ফলে বাংলা কবিতা থেকে (কিছু অঞ্চলব্যাতিত) ন্যাকামি-টাইপ কথার্বাতা প্রায় বিদায় নিয়েছে। এই প্রসঙ্গে ১৯৫৪ সালের সেনেট হলে অনুষ্ঠিত দু'দিনব্যাপি কবি সম্মেলনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এই কবি সম্মেলনের পর বাংলা কবিতায় সৃষ্টি হয়েছিল একটি প্রবণতা; আর তা হলঃ কাব্যপাঠ কবিকর্মের একটি অঙ্গ। চলল কিছুদিন। তারপর ভাব-ভাষার সোজাসুজি প্রকাশ ভঙ্গিটি ক্রমে কবিদের কাছ থেকে সরে আশ্রয় নিলো মিডিয়াবাজদের হাতে। আর তখনই কবিতা ভুল অর্থে হয়ে উঠল সামাজিক। তবে আজকাল সাবজেক্টিভ কবিতার র্চচা তেমন একটা হয়-ই না বললেও চলে। চারপাশের বহুর্মুখি অভিজ্ঞতা ও বিষয়ের বৈচিত্র্যতার ফলে সমকালীন (পরীণপ্রিয়) কবিদের কবিতায় চর্চিত হচ্ছে নিত্য-নতুন কনসেপ্ট। এর ফলে আধুনিক মন ও মনন বিশ্বায়নের ইতিবাচক সারায় মিলে যাচ্ছে। সঙ্গত কারণে, কবিতা পাঠককে (লেখক-পাঠক) কবিতা পড়তে হলে বসতে হচ্ছে অনেকগুলো চোখ নিয়ে।

আর এই এক একটি চোখ বহুদৃশ্য ধারণে সম।

এই সম চোখগুলোকে পুঁজিতে রেখে যারা অনুভূতির রাজ্যে সংকেত ও ইঙ্গিত নিয়ে নাড়াচাড়া করে আমি লেখালেখির েেত্র ঐ দলে থাকতেই স্বাছন্দবোধ করি। আর বিশ্বাস করি, কবিতা পাঠকরা কবিতাকে অনুভব করার জন্য মুটামুটি একটা প্রস্তুতিপর্ব পেরিয়ে অন্বেষণপর্বে নামেন। এই বিশ্বাস অল্পবিস্তর প্রায়োগিক হলেও; অমূলক নিশ্চয়ই নয়। কঠিন শব্দ দিয়ে কবিতা-শরীর গড়ার চেয়ে প্রচলিত ও পরিচিত শব্দের বুননে যে কবিতা রহস্যের চাদরে ঢেকে থাকে সে রকম কবিতার প্রতিই আমার আগ্রহ বেশী। কবিতা পড়ে অনুভূতির রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া; হারিয়ে খুঁজে পাওয়া অথর্াৎ আবিস্কার-প্রবণতা রয়েছে এমন কবিতার প্রতি-ই ঝোঁকটা বেশী। যে সকল কবিতা পড়ে আবিস্কার করার মত কিছুই থাকে না কিংবা যে কবিতা চর্চায় রহস্যময়তা নেই, সে মত কবিতা চর্চায় অথবা পঠনে আমার আগ্রহ কম। কবিতার বিচারে অনুভূতি-ই হবে প্রধান নিয়ামক। আর এর প্রতিধ্বনিটা যেন নিজের কবিতায় শুনতে পাই সে দিকে ল্য রাখার চেষ্টা করি।

প্রকৃতির উপর মানুষের জয় ঘোষণার মধ্য দিয়ে আমরা যে আত্ননির্ভশীল সমাজ-প্রক্রিয়া অতিক্রম করছি; সচেতনভাবে ল্য রাখতে হবে সেখানে যেন আবার কোন অদৃশ্য শক্তি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে না পারে।

স্বর-সন্ধানী কবি জফির সেতু'র ঃ "সহস্র ভোল্টের বাঘ"

[সহস্র ভোল্টের বাঘ। জফির সেতু।
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারী ২০০৬।
প্রকাশকঃ শুদ্ধস্বর, ঢাকা।
প্রচ্ছদঃ সব্যসাচী হাজরা।
মূল্যঃ পঞ্চাশ টাকা।]

সহস্র ভোল্টের বাঘ!
সাধারণত বাঘ বলতেই আমরা তেজদীপ্ত, সাহসী ও শক্তিশালী কোন কিছু ভেবে থাকি। আর সেই বাঘ যদি হয় সহস্র ভোল্টের_ তবে তো নিজেকে আরো সচেতন ভাবে প্রস্তুত করতে হয় সেই 'সহস্র ভোল্টের বাঘ' এর গর্জন শুনার জন্য।
বইয়ের ফাপ ও বিভিন্ন লিটলম্যাগ দেখে জানা যায় 'সহস্র ভোল্টের বাঘ' এর কবি, জফির সেতু ছোট কাগজ চর্চার সাথেও জড়িত। তাছাড়া ফাপের প্রথম অংশে লিখিত বেনামী প্রাককথণে যখন দেখি...' _ যা অবশ্যই রাহমানের চিড়িয়াখানা-র চাইতে পৃথক, মাহমুদের আসঙ্গলিপ্সার থেকে দূরবর্তী, _গর্জমান এবং আলো-বিচ্ছুরণশীল যে চোখ ঝলসে দিতে সম...' তখন চোখের হিসেব ছেড়ে দিয়ে কানকে বলি_ তুমি প্রস্তুত হও গর্জন শুনার জন্য, মস্তিস্ক প্রস্তুত হও ধারণের জন্য আর হৃদয় তৈরী থেকো অনুভবের জন্য। তবে এবার কবি জফির সেতু 'সহস্র ভোল্টের বাঘ' এর গর্জন কতটা সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন সাদা কাগজের প্রতিটি পৃষ্ঠায়; তা আবিস্কারের জন্য পাঠ শুরু করা যাক।
যেহেতু এই কবির স্বর রাহমান কিংবা মাহমুদের মত নয়, (হবে-ই-বা কেন?) তাই একজন কবি'র কবিতা চলমান দশকেই পঠিত হচ্ছে বলে পাঠকের অতিরিক্ত মনোযোগ দাবী করতেই পারে।

"সিন্ধুর গোপন গান জীবনে খুব কম লোকে শোনে
আমাকে প্রতিভু পাখি ভেবে যারা বসিয়ে রাখে পাতায়
তাদের নাড়িতে টাইগ্রিস লোহিত উত্তেজনায় কাঁপে"
'এমন বসন্তদিনে'


তাই সঙ্গত কারণেই ছাবি্বশটি গর্জনে কেমন করে ফঁটে উঠেছে 'সহস্র ভোল্টের বাঘ' এর চরিত্র_ তা দেখার দাবী রাখে।

"টাওয়ার থেকে যে ফড়িংটি নেমে এল
তার জন্য দরকার আরেকটি ইকোপার্ক
পৃথিবীর পথে পথে ইলেকট্রিক সিগন্যাল
এই ভেবে আমরা যখন পা থেকে কাদা ঝাড়ছি
নারীরা কী ভেবে যে ঘুম ঘুম চোখে কাঁদছে, শুধু কাঁদছে"
'ফড়িং'

আমার কাছে মাঝে-মধ্যে মনে হয়, একটি লাইন-ই বুঝি কবিতার প্রাণ কিংবা সমগ্র কবিতাই বুঝি একটা লাইন। যেখানে অনুভূতির গভীরে সহস্র লাইনের বিচ্ছুরণ ঘটে। আর এমন একটি প্রসঙ্গের আলোচনায় আবু হাসান শাহরিয়ার বলেছিলেন, 'আসলে সবাই মিলে আমরা একটা কবিতা-ই তো লিখে চলেছি। এ যেন সহস্র নদীর একটি ঢেউ-এর মত।' তাঁর-ই এক লাইনের একটা কবিতা আছে এমন_ 'নষ্ট চোখে পাখিকেও পৃথিবীর ময়লা মনে হয়।' তেমনি জফির সেতু'র কবিতায়ও কিছু প্রাণসঞ্চারী পংক্তি আছে। পাঠকের জন্য উল্লেখ্য করছি_
ক. 'এখন তাদের এঁদো দালানে দুপুর রাতে পথ হারায় অন্ধ জোনাকি' [প্রত্যহ প্রবাহ]
খ. 'রাষ্ট্র বিপ্লবে কামার্ত রমণীরা কখনো বীরপ্রসূ হতে পারে না' [জীবন বৃত্তন্ত]
গ. 'মধুর চাকের অন্ধকার আমাকে জাগিয়ে রাখে' [আত্নজৈবনিক]
ঘ. 'কত লোভ আর ঝড়ো অন্ধকার মৃত্তিকার পাহাড়ে' [স্তন]
ঙ. 'পাতার আড়ালে পড়ে আছি অহেতুক পতঙ্গের মতো বহুকাল' [অহেতুক পতঙ্গ]

তবে কবিতার বিচারে কোন মন্তব্যই চিরস্থায়ী নয়। সময়ের প্রেেিত এর আবেদন বদলাতে পারে এবং বদলায়। 'আমরা জানি সময়ের বিবর্তনে আধুনিকতার সংজ্ঞার্থের যেমন চরিত্র বদল ঘটেছে, তেমনি এককালের আধুনিকেরা সময়ের নির্মম বিচারে প্রথাগত অবিধায় বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু একটা জাতিস্বত্তার মিথ, প্রত্নস্মৃতি, নৃবৈজ্ঞানিক প্যারাডাইম, ঐতিহ্যবোধ, প্রেম-অপ্রেম, মন ও মনন যখন কোন কবির আধার ও আাধেয়কে সম্পন্নতা দান করে_ তখন প্রথাচিহ্নিত বর্জনের তালিকায় তাকে নিপে করা যায় না।' [ভূমিকা ঃ বাংলাদেশের তিন দশকের কবিতা: রফিক উল্লাহ খান]
কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কবিকে চিহ্নিত করতে হয় তাঁর স্বাতন্ত্র বা রহঃড়হধঃরড়হ দিয়ে। পূর্ববতর্ী থেকে নিজেকে আলাদা হিসেবে ঘোষণা দিলে তার জন্য প্রয়োজন পড়ে কিছূ আলাদা বৈশিষ্ট্যের।

শিশুর কড়ে আঙুলে গাঢ় টৌকা মারি ফড়িঙের ডানায় একটা হেলিকপ্টার বাঁধি' (ছায়া)

উক্ত কবিতাটিতে যে 'সহস্র ভোল্টের বাঘ' এর গর্জন মুদ্রিত হয়েছে তা আবিস্কারের পর কবি'র অভিলাষের প্রসংশা না করে পারা যায় না। এই পংক্তিতেই সহস্র ভোল্পের বাঘ এর সত্যিকারের গর্জন প্রকাশিত হয়েছে বলে মনে হয়।
কিন্তু 'প্রেম' কবিতায় যখন একই কবি আবার লিখেন_

'প্রেম, মাঝরাতে সঙ্গমরত টিকটিকি ধপাস করে বুকের উপর পড়ে যায়
দুপুরে অফিস ফাঁকি দিয়ে ছুটা বুয়ার সাথে ধস্তাধস্তি করে
প্রেম, তাগড়া ষাড়ের মতো মাটিতে হুংকার দিয়ে তেড়ে তেড়ে আসে
আমি কখনো এদের সামনে সাহস করে দাঁড়াতে পারি না!

তখন ভাবি, নীতি-নৈতিকতার ভয়ে যে কবি 'প্রেম' এর মত 'ট্রাডিশনাল ইমোশন' এর মুখোমুখি হতে ভয় পান তিনি নিজের

উম্মে মুসলিমার 'হ-য-ব-র-ল'

পত্রিকার বিভিন্ন সাময়িকীর সুবাদে উম্মে মুসলিমার লেখা পড়ার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে কালের খেয়ায় প্রকাশিত লেখাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়েছি বিগত দিনে। প্রতিটি লেখা ('ডার্করুম সহকারী' 'অসম' 'সৌদি চুড়ি') পড়ার শেষে বারবারই মনে হয়েছে তার প্রেেিত কিছু লেখি। কিন্তু সেই কাজটি হয়ে উঠেনি মূলত অলসতার কারণে। যাইহুক, এবার ৬৪-তম সংখ্যায় তাঁর লেখা গল্প 'জেবুনি্নসা' পড়ে মনে হল সত্যিই কিছু লেখা দরকার।

জেবুনি্নসা গল্পের শুরু এভাবে, 'আরতি রানী দত্ত ম্যাট্রিক পরীার পরপর বাড়ি থেকে উধাও।' অথর্াৎ গল্পের শুরুতে পাঠকদের ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে, আরতি যখন পরীা দেয় তখন দেশে ম্যাট্রিক (ম্যাট্রিকুলেশন; এস,এস,সি নয়) ধারণা প্রচলিত। তার মানে ঘটনার সময়কাল নির্দেশ। তবে আরো একটি জায়গায় সময়কালের ধারণা পাওয়া যায়। গল্পের চরিত্র সাবু (সাবুদ্দিন) সমর্্পকে লেখক বলেন, 'রামচন্দ্রপুরে ওরকম নায়করাজ রাজ্জাক কাটিং (রাজ্জাক কাটিং?) চেহারা আর ক'জনের আছে?' সুতরাং এ থেকে আমরা ধরে নিতে পারি গল্পের সময়কাল সত্তর থেকে আশি দশকের মাঝামাঝি। তখন অনেক তরুণই নায়ক রাজ্জাক দ্বারা প্রভাবিত হতেন। সেই সময়ের একটি হিন্দু পরিবারের মেয়ে আরতি এবং আপাদমস্তক মুসলিম পরিবারের ছেলে সাবুর সংপ্তি প্রেমকে কেন্দ্র করে গল্পের ব্যাপ্তি। আর সেই আরতির বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক বলেছেন, 'মুখখানা যেন ঠিক সরস্বতি ঠাকুরের মতো।(ঠিক বুঝলাম না 'সরস্বতি ঠাকুর' কথাটার মানে কি?) সেই আরতি প্রতিদিন সাবুর দোকানের সামনে দিয়ে স্কুলে যায়। গল্পকার দুজনের মধ্যে প্রেম বুঝাতে শুধু ইঙ্গিত করেছেন, 'সাবুর দিকে আরতি একবার তাকাবে, সাবু তাতে নিশ্চিত ছিল।' এছাড়া যেহেতু প্রেম কি করে হল তার আর কোন ইঙ্গিত নেই, তাই ধরে নিতে পারি লেখক আমাদেরকেও বলছেন যে, এদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে আপনারা নিশ্চিত থাকুন। গল্প থেকে আরো জানা যায় সেই সময়ের একটি মফস্বল এলাকার গঞ্জে আরতির জ্যাঠাতো ভাইয়ের দোকানে এবং সাবুর দোকানে টেলিফোন রয়েছে! সেই টেলিফোনের সাহায্যে জ্যাঠাতো ভাই দোকান থেকে খেতে গেলে আরতি সাবুর সাথে ফোনে ফিসফিসিয়ে কথা বলে। অথর্াৎ সেই সত্তর-আশি দশকে ফোনালাপে প্রেম! তবুও লেখককে ধন্যবাদ তিনি চরিত্রগুলোর হাতে মোবাইল ধরিয়ে দেন নি! সেই ফোনালাপে আরতি এতই মগ্ন হয় যে ইসলামী নিয়ম-কানুন শিখার জন্য বাজার থেকে নিজেই 'সহজ নামাজ শিা' কিনে আনে! প্রেমাসক্ত আরতি নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে ইসলামের জন্য! অবশ্য লেখক এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, 'আরতিরও ইসলাম ধর্ম গ্রহণে কোনো আপত্তি নেই।' সাবুরা এলাকায় প্রভাবশালী। অবস্থাসম্পন্ন মিয়া বাড়ির দরাজ মিয়ার তৃতীয় কনিষ্ঠ পুত্র সে। তার পিতা আবার মসজিদের ইমাম। আর সেই ইমামের ছেলে সাবু ভাগিয়ে নিয়ে আসে আরতিকে নিজের বাড়ি। এদিকে আবার হারিয়ে যাওয়া আরতিকে দুদিনেও খুঁজে পায় না তার পরিবার। পরে আরতির মা মেয়ের বালিশের নিচে থেকে নামাজ শিা এনে তার ভাশুরের ছেলেদের দেখান। (আরতির বাবার কোন উল্লেখ নাই) তা দেখে জ্যাঠাতো দাদা লণ যৌতুকে পাওয়া হান্ড্রেড টেন (হান্ড্রেড টেন! রাজ্জাকের সময়কালে!) মোটরবাইক চালিয়ে সাবুর বাড়ি খুঁজতে আসে। আমরা ল করি যে, গল্পে আরতির দাদা হান্ড্রেড টেন মোটর সাইকেল চালায়, দোকানে টেলিফোনও আছে। অপর দিকে সাবুর বাবা চলাচল করেন ছইওয়ালা মহিষের গাড়ি দিয়ে। এসবের প্রেেিত আসলে কে যে অবস্থাসম্পন্ন; প্রশ্ন জাগে? তারপরও লেখক যেহেতু বলেছেন সাবুর বাবা অবস্থাসম্পন্ন অতএব, সাবুর বাবাই অবস্থাসম্পন্ন। সেই অবস্থাসম্পন্ন কড়া ইমাম (গল্পে উল্লেখ আছে, 'দরাজ মিয়ার কড়া নির্দেশ, তার জীবদ্দশায় কেউ আলাদা হতে পারবে না।) পিতার কনিষ্ঠ পুত্র হিন্দু মেয়েকে বউ করার জন্য নিয়ে আসায় তিনি খুবই পুলকিত! তার পুলকের বর্ণনা পাওয়া যায় আরতিকে খুঁজতে আসা জ্যাঠাতো ভাইয়ের সাথে কথোপকথনে। তিনি তাকে সাবুর বন্ধু ভেবে বলেন, 'ও, সাবুর ইয়ার বুঝি আপনি? এত দেরি করলেন আসতে? আজতো আমার সাবুর বৌভাত। কোনো অসুবিধা নেই। আপনি তসরিফ রাখুন। হাতে মুখে পানি দেন। আমি আগে খানার ব্যবস্থা করি।' পরে যখন তিনি আরতির জ্যাঠাতো ভাইকে চিনতে পারেন, তখন সাবুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'তোর বড় কুটুম বুঝি? আরে আপনি হচ্ছেন আমাদের সবচেয়ে সম্মানিত মেহমান।...সাবু তুই আমার জেবুনি্নসা মাকে নিয়ে আয়' অথর্াৎ এই ফাঁকে বিয়ে হয়েছে। আরতির নাম বদলিয়ে রাখা হয়েছে জেবুনি্নসা। সেই জেবুনি্নসা কি সাবলীল ভাবে তার জ্যাঠাতো ভাইয়ের সামনে এসে বলে, 'মা-বাবাকে চিন্তা করতে নিষেধ করবে। আমি খুব ভাল আছি।' এই তার পরিবারের সাথে শেষ আলাপ। পরবর্তি অংশে চলে জেবুনি্নসা ওরফে আরতির মুসলিম রীতি-নীতি আত্নঃস্থ করার পালা।



সাবুর বাবার উদারতা মুগ্ধ হওয়ার মত। তবে আমরা তো এই সমাজেরই মানুষ। তাই সমাজের মানুষগুলোর বৈশিষ্ঠের কথা কম বেশী সবার জানা আছে। আজ এই একবিংশ শতাব্দিতেও দরাজ মিয়ার মত উদারপন্থি ইমাম, যে কিনা মহা খুশিতে তার হিন্দু পুত্রবধূকে বরণ করে নেয়; চোখে পড়ে না। আর সময়টা যদি হয় সত্তর-আশির দশকের মফস্বল_ তবে তো কথাই নেই। গল্পের আরো কিছু ব্যাপার অবাক করে দেয়। আমরা জানি, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যুগ যুগ ধরে ঢাক বাজিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব পালন করে আসছে। কিন্তু তা বাজানো হয় কিছু নির্দিষ্ঠ সময়ে। যেমন, ষষ্ঠীতে সন্ধ্যার পর ঢাক বাজিয়ে ধূপ জ্বালিয়ে পূজা মন্ডপগুলোতে বোধন সম্পন্ন করা হয়। এই রীতি হয়তো মুসলমান অধূ্যসিত এলাকায় রমজান মাস হলে সময়ের কিছুটা এদিক সেদিক করে পালন করা হয় কিন্তু কখনোই তা ভোরে চলে যায় না। গল্পকার যখন লেখেন, 'পরদিন ষষ্ঠী। ঠাকুর ভিটেয় উঠবে। ভোরবেলা ঢাকে কাঠি পড়ল। আরতির বুকের মধ্যে বাদ্য বেজে উঠল...' তখন বাদ্য আমাদের বুকেও বেজে উঠে আর তা হচ্ছে বিস্ময়ের! আর বিস্ময় নিয়ে ভাবি, একি অন্য রীতির প্রতি লেখকের অবহেলা নাকি অজ্ঞতা? অজ্ঞতাই বা বলি কি করে!

গল্পটা পড়ে কি বুঝা গেল কিংবা কেন লেখা হল; তার কোনো উত্তর মিলে না। এই গল্পের উদ্দেশ্য কি প্রশ্ন করলে যদি উত্তর হয় জেবুনি্নসা ওরফে আরতির মাধ্যমে রমজান মাস উপল েপাঠকদের আবারো ইফতারের দোয়া (গল্পে আরতির মুখ দিয়ে সম্পূর্ণ ইফতারের দোয়া পড়িয়েছেন গল্পকার) মনে করিয়ে দেয়া তবে বলল উদ্দেশ্য একেবারে সফল। ধান ভানতে শিবের গীতটা একটু বেশী গাওয়া হল; এই যা। আর যদি গল্পের শিল্পমূল্যের দাবী উঠে তবে কিন্তু পাঠক নিরুপায়।
প্রকাশক কিংবা সম্পাদকের অনুরোধে অনেক লেখকই লেখা তৈরী করেন। 'জেবুনি্নসা' গল্প পড়ে মনে হয়েছে যেন লেখককে কেউ বলেছেন_ সামনে রোজা এবং পূজা। এই পূজা আর রোজাকে কেন্দ্র করে হিন্দু ও মুসলিম পরিবারকে নিয়ে একটি প্রেম জাতীয় লেখা তৈরী করুন; যা পাবলিক খাবে। আর যেহেতু আপনি মুসলমান এবং মুসলিম প্রধান দেশ সুতরাং সে ধর্মই যেন প্রাধান্য পায়। এরকম ঘটনা যদি অন্য যেকোন সাময়িকীর েেত্র ঘটতো তাহলে বলার কিছু ছিল না। কিন্তু কালের খেয়াকে কেন্দ্র করে আরোপিত, ফরমায়েসি লেখক গড়ে উঠুক; এমনটা কখনোই কাম্য নয়।
আমরা যারা পাঠক তারা জানি, গল্পকারকে সমাজ, সময়, সংস্কার ও কাহিনী বর্ণনায় সজাগ থাকতে হয়। খেয়াল রাখতে হয় লেখাটা যেন শুধু শুধু কলমের টানে এগিয়ে না গিয়ে বিবেক-বোধ, যুক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়। সেই সাথে পাঠকের আস্থা ও চাহিদাকে মাথায় রেখে সম্পূর্ণ বিশ্বস্থভাবে উপস্থাপনের প্রয়োজনও রয়েছে। আরোপিত কাহিনী পাঠকরা চীরকালই প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং সেই সাথে সাথে লেখককেও। কিন্তু এমনটা যেন উম্মে মুসলিমার েেত্র না ঘটে। কারণ এই গল্পকারের লেখার মত পর্যাপ্ত মতা আছে। শুধু মতাটা একটু যাচাই করে একটা গল্প তাঁর কাছে যতটুকু সময় দাবী করে সেই অনুপাতে ব্যবহার করা উচিত। আর একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে তাঁর কাছে এটুকু দাবী নিশ্চয়ই করতে পারি?