পৃষ্ঠাসমূহ

আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, ইসলাম ও প্রজন্মের ব্যবধানে মুখোমুখি পিতাপুত্র

"Our social system, Islam and father/son face to one another because of the Generation Gap"

আমাদের সমাজের মানুষজন কতটা অদ্ভূত তা একটু পর্যবেক্ষণ করলেই দেখা যায়। আমাদের কথায় এবং কাজে অমিল আর ভ্রান্ত এবং একঘুয়ে যুক্তি দেখিয়ে যারা জীবন পার করে দিতে চান, আজ সেই সকল পূর্বপুরুষের সাথে সংঘাত দেখা দিচ্ছে উত্তরপুরুষের। আমাদের সমাজ ব্যবস্থার বৈচিত্র নিয়মনীতি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে পিতা-পুত্রকে মুখোমুখি। পুরুষতান্ত্রি সমাজ ব্যবস্থায় কর্তত্ব নির্ধারিত হয় পুরুষকে কেন্দ্র করে। আর তাই বিরোধ বা মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় তাদেরকেই। কেউ যদি প্রথা ভেঙে বেরুতে চায়, তাহলে তার ক্ষেত্রেই এই সমস্যাটি দেখা দেয়। যার প্রধান কেন্দ্রে রয়েছে ধর্ম। ধর্মকে কেন্দ্র করে বাস্তবতার নিরিখে চলুন দেখি একটি সংলাপঃ

যখন ধর্ম এবং ঈশ্বরে বিশ্বাসী কোনও মানুষ, ধর্ম বা ঈশ্বরে বিশ্বাস নিয়ে অন্য কাউকে প্রশ্ন করেন, এবং উত্তরে যদি শুনতে পান যে উত্তরদাতা নাস্তিক, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রশ্নকর্তার ঠোঁটে একধরণের তাচ্ছিল্যের হাসি খেলা করে। এই হাসি দেয়ার পর অনেকেই যে মন্তব্যটি করেন তা হচ্ছেঃ

“হেহ ! নাস্তিক্য ! এটা তো আজকাল একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।”

এমন নাস্তিক সম্ভবত একজনও পাওয়া যাবে না, যিনি এই কথাটি জীবনে একবারও শোনেননি। প্রয়াত হুমায়ুন আজাদ তার “আমার অবিশ্বাস” বইয়ের “বিশ্বাসের জগৎ” প্রবন্ধে লিখেছেনঃ

“একটা কিছু বিশ্বাস করতে হবে মানুষকে, বিশ্বাস না করা আপত্তিকর। আপনার পাশের লোকটি স্বস্তি বোধ করবে যদি জানতে পারে আপনি বিশ্বাস করেন, তার বিশ্বাসের সাথে আপনার বিশ্বাস মিলে গেলে তো চমৎকার; আর খুবই অস্বস্তি বোধ করবে, কোনো কোনো সমাজ আপনাকে মারাত্মক বিপদে ফেলবে, যদি জানতে পারে আপনি বিশ্বাস করেন না। বিশ্বাস কয়েক হাজার বছর ধ’রে দেখা দিয়েছে মহামারী রূপে; পৃথিবীর দীর্ঘস্থায়ী মহামারীর নাম বিশ্বাস।”

বলাই বাহুল্য, এই বিশ্বাসটি হচ্ছে ধর্ম এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস, এবং মহামারীটি হচ্ছে ধর্ম বা ঈশ্বরে বিশ্বাসের রোগ। ভাবটা এমন যে, সবাইকে এই রোগে আক্রান্ত হতেই হবে, সবাইকে একই গোয়ালের গরু হতেই হবে। কেউ যদি এই রোগে আক্রান্ত না হয়, তাহলেই তার আরোগ্য, অর্থাৎ নাস্তিক্য, হয়ে যায় বাকী সবার চোখে ফ্যাশন, বা শো-অফ করার উপায়।

পুত্রঃ
আপনি ধর্মের নামে গাছ-পালা, মূর্তি-পাথর বা গরু-ছাগল কিংবা কালো-সাদা ঘরবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে শারীরিক কসরৎ করলে সেগুলো অস্বাভাবিক হয়না, আর কেউ যদি সেগুলো না করে, তবেই সে অস্বাভাবিক হয়ে যায়? কী কারণে নাস্তিক্যকে শো-অফ বলা হচ্ছে ?
পিতাঃ
“এটা সবার চেয়ে আলাদা হতে চাওয়ার একটা প্রবণতা। ধর্ম নিয়ে উলটাপালটা কিছু বললেই বিখ্যাত হওয়া যায়, বিতর্কিত হওয়া যায়। আর বিখ্যাত হওয়ার এই সহজ পথ কে ছাড়বে? নাস্তিক্য তো একটা ফ্যাশন!

পুত্রঃ
মানুষের বিশ্বাস যদি হয় ফ্যাশন বিচারের মাপকাঠি, তাহলে ইসলাম একটা ফ্যাশন, হিন্দুধর্ম একটা ফ্যাশন এবং পৃথিবীর যাবতীয় বিশ্বাস হচ্ছে ফ্যাশন। সেই অনুযায়ী, আপনি যদি ধর্ম পালন করে ফ্যাশন দেখাতে পারেন, তাহলে আমি ধর্ম পালন না করে ফ্যাশন দেখাতে পারবো না কেন ?

পিতাঃ
না মানে, বলতে চাইছি এটা বাকী সবার চেয়ে আলাদা হওয়ার একটা চেষ্টা, তাই না ?

পুত্রঃ
নির্দিষ্ট ধর্ম পালনই হচ্ছে আসলে মানুষের চেয়ে আলাদা হওয়ার চেষ্টা। আপনি একটি ধর্ম গ্রহণের সাথে সাথে ওই ধর্মটি বাদে পৃথিবীর বাকী ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা হয়ে গেলেন, তাই নয় কি ? শুধু তাই নয়, এটা আপনাকে একেবারেই আলাদা করে দেবে। এক ধর্মের বিশ্বাসের সাথে আরেক ধর্মের বিশ্বাসে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এক ধর্ম অন্য ধর্মকে বাতিল করে দেয় এবং অন্য ধর্মাবলম্বীকে ভালো চোখে দেখে না। তাই আপনাকে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী থেকে শত হাত দূরে থাকতে হবে। তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে ? ধর্ম পালন হচ্ছে বাকী সবার চেয়ে আলাদা হওয়ার চেষ্টা।

পিতাঃ
এটা আসলে হুমায়ুন আজাদ বা তসলিমার মত বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা !

পুত্রঃ
তাহলে ইসলাম পালন হচ্ছে জাকির নায়েকের মত বা হিন্দু ধর্ম পালন করা হচ্ছে সাঁই বাবার মত বিখ্যাত হওয়ার প্রচেষ্টা। একজন হুমায়ুন আজাদ বা তসলিমা বাংলাদেশে বিখ্যাত হয়েছেন বটে, কিন্তু ধার্মিক হয়ে তো আরও ব্যাপক লাভ। বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ববিখ্যাত ধার্মিক জাকির নায়েকের মত কোনও বিশ্ববিখ্যাত নাস্তিকের নাম বলুন তো, যাকে সাধারণ মানুষ এক নামে চিনবে ! পারবেন কি ? তো নাস্তিক্যের হাত ধরে যদি জনপ্রিয়তা না-ই আসে, তাহলে নাস্তিক্য আর জনপ্রিয় হওয়ার হাতিয়ার থাকলো কীভাবে ? আমি তো বরং বলতে পারি, জনপ্রিয় হওয়ার নয়, বরং নাস্তিক্য হচ্ছে ধর্ম-সংবেদনশীল দেশে বেঘোরে নিজের প্রাণটা হারানোর হাতিয়ার। জনপ্রিয় হুমায়ুন আজাদ বা জনপ্রিয় তসলিমার পরিণতি আপনাদের মত ধার্মিকেরাই কী করেছে, তা কি আমরা দেখিনি ? C.T.V.N. চ্যানেলের অনুষ্ঠানে ভারতীয় যুক্তিবাদী প্রবীর ঘোষকে খুনের হুমকি দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের সেরা ধনী জ্যোতিষী “আচার্য্য সত্যানন্দ”। কে চায় অযথা জনপ্রিয় হতে গিয়ে নিজের গলা “বিসমিল্লাহ” বা “ওঁ” লেখা ছুরির নিচে পেতে দিতে?

পিতাঃ
না ঠিক আছে, নাস্তিক তুমি, ভালো কথা। কিন্তু আজকাল তো অনেকে না জেনেই নাস্তিক হয়। কিছুই জানে না, অথচ বলছে আমি নাস্তিক। ফেসবুকে রিলিজিয়াস ভিউ দিয়েছে এথিস্ট। এগুলো আসলে ভাঁওতাবাজী এবং লোক-দেখানো কাজ।

পুত্রঃ
নাস্তিক হওয়ার জন্য যে অনেক কিছু জানতেই হবে, এটা কে বলেছে ? আপনি যখন নিজেকে ধার্মিক হিসেবে পরিচয় দেন, তখন কি কেউ জানতে চায়, যে আপনি আপনার ধর্মের যাবতীয় বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানেন কিনা ? ফেসবুকে যখন আপনি রিলিজিয়াস ভিউ থিস্ট লেখেন, তখন কি কেউ ভ্রু কুঁচকে বলে, আপনি কেন থিস্ট ? যে কোনও বিষয় সম্পর্কেই জানা ভালো, কিন্তু জানা বিষয়টাকে আপনি শর্ত হিসাবে দিতে পারেন না। আপনি যেমন সবকিছু জেনে ধার্মিক হতে বাধ্য নন, আমিও সবকিছু জেনে নাস্তিক হতে বাধ্য নই।


পিতাঃ
যদি গুটিকয়েক বালক-বালিকা নিজেদের পরিচয় দেয় নাস্তিক হিসেবে “জাস্ট ফ্যাশন” বলে, তাতেও তো ক্ষতিকর কিছু নেই। ফ্যাশন মানেই খারাপ, তা তো নয়! বরং ধার্মিক হবার ফ্যাশন, এটাই সত্যিকারের ফ্যাশন। কারণ, অধিকাংশ পাবলিক কিছু না জেনে ধর্মবিশ্বাস নামের গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসায়।

পুত্রঃ
যারা পারিবারিক সূত্রে কোনও একটা ধর্ম পেয়েছে এবং লালন করে চলেছে, তারা কিন্তু না জেনেই ধার্মিক। বেশির ভাগ ধার্মিকই না জেনে ধার্মিক। একটা শিশুর জন্মের সাথে সাথেই সে পরিবারের ধর্মটা পেয়ে যায়। তখন কিন্তু কেউ প্রশ্ন করে না যে, এই শিশু জেনে ধার্মিক, নাকি না জেনে ধার্মিক।
তাই, না জেনে ধার্মিক, আর না জেনে নাস্তিক সমান কথা। এটা একজন মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপরে নির্ভর করে যে সে কী মানবে বা মানবে না। সে যদি না জেনেই কিছু মানে, তাহলে যদি ভ্রু কোঁচকানোর কিছু না থাকে, তাহলে যদি কেউ না জেনেই কিছু না মানে, তাহলেও ভ্রু কোঁচকানো যাবে না।

পিতাঃ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভ্রু কোঁচকানোর কারণটা কী?

পুত্রঃ
মানুষ সব সময়ই চায় দলে ভারী হতে। যেমনঃ আপনার পাশের লোকটি আপনার কোনও কথার সাথে একমত হলে আপনি তাকে স্বাভাবিকভাবেই নিজের মত একজন লোক বলে মনে করেন, এবং নিজের পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পান, একটা সমর্থন বা সাপোর্ট পান। মানুষের সাইকোলজিকাল ক্যারেক্টারই এরকম। যে কেউ নিজের মতের পক্ষে সমর্থন পেলে সুখী বোধ করে।

তা ধার্মিকেরা সুখী বোধ করুন, সমস্যা নেই। তাদের মতের সমর্থন দেয়ার জন্য পৃথিবীতে মানুষের অভাব পড়ে যায়নি। তবে নাস্তিকদের সেই সমর্থনটা দরকার হয় না। কেউ সমর্থন করবে না জেনেই নাস্তিকেরা নাস্তিক হয়। পরিবারের সমর্থন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই থাকে না, থাকে না বন্ধু-বান্ধবদের সমর্থন। শুধু নাস্তিক্যের কারণেই যে পরিমাণ বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়, তাতে নাস্তিকদের কেমন লাগে ? ভালো নিশ্চয়ই লাগে না ! অ্যাকটিভ নাস্তিকদের সম্পর্ক নষ্ট হতে থাকে ধার্মিক প্রিয় মানুষগুলোর সাথে। কিন্তু এটা কি হওয়া উচিত ? নাস্তিক্যকে ফ্যাশন বা একধরনের অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে ধার্মিকেরা যে ক্রমাগত নাস্তিকানুভুতিতে আঘাত দিয়ে যাচ্ছেন, সেটা কি মেনে নেয়া যায় ?

অথচ, এই নাস্তিকেরাই যখন ধর্মের সমালোচনা করেন, তখন ধার্মিকেরা চিৎকার করতে থাকেন, “অন্য মতের ওপর শ্রদ্ধা থাকা উচিত।” এই শ্রদ্ধাটা ধার্মিকরা নাস্তিকদের মতের ওপর দেখাচ্ছেন না কেন ?

বিচার কি সবার জন্য একই মাপকাঠিতে হওয়া উচিত নয় ?

পর্দাপ্রথা ও ইসলাম; নারীর অগ্রগতি দমনের সূক্ষ্ণ কৌশল।

ধর্ম যখন মানুষের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন কল্যানের চেয়ে অকল্যানই বেশী ঘটে একটি জাতির জীবনে। তাই হয়ে এসেছে চীরকাল, ইতিহাস তাই বলে। অথচ কে না জানে, মানুষের জন্য ধর্ম এসেছিল, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। আজ যেনো মানুষ হয়ে গেছে গৌণ আর ধর্ম হয়ে উঠেছে মূখ্য এক শ্রেণীর মোল্লা-পুরোহিতদের কাছে। আর এই ধর্মের নামে তথাকথিত শরিয়ত এর খাতিরে নারী সমাজকে বলি হতে হচ্ছে মোল্লাতন্ত্র আর পুরোহিতের যাঁতাকলে।
ইসলাম ধর্মে নারীকে যতটা না অবরোদ্ধ রাখার প্রচেষ্ঠা করা হয়েছে, আর সকল ধর্ম মিলেও তার সমান হবে না।
ইসলামী দেশ এবং এর রীতিনীতির মধ্যে যা আসে তার মধ্যে পর্দাপ্রথা বা হিজাব অন্যতম।
আমাদের দেশ সাংবিধানিক ভাবে ধর্মীয় হলেও গণতান্ত্রিক শাষণ ব্যবস্থা বিদ্যমান। যেহেতু আমাদের দেশে এখনও কোরান ও সুন্নাহর শাসন ব্যবস্থা চালু হয়নি, তাই নাগরিকরা কিছুটা ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করে আসছেন এবং বিধর্মীরা একটু শান্তিতে বসবাস করতে পারছেন। কিন্তু কোরান ও সুন্নাহভিত্তিক শাষণ ব্যবস্থা চালুর জন্য মরিয়া কিছু উগ্র ইসলামী রাজনৈতিক দল এবং এর অংগ সংগঠনগুলো ইসলামী বিভিন্ন কট্টরপন্থি নিয়মনীতি চালু করে দিয়েছে। তার মধ্যে হিজাব উল্লেখ্যযোগ্য। কারণ তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু নারী। কেনোনা তারা জানে একটি নারীকে বন্দী করতে পারলে পরিবারকে বন্দি করা সম্ভব। তাছাড়া, নারী জাতি সহনশীল এবং তুলনামুলকভাবে কম প্রতিবাদী হওয়ায় তাদেরকেই লক্ষবস্তুতে পরিণত করেছে উগ্র ইসলামী গুষ্ঠিগুলো। আর এর প্রভাব পড়েছি বাংলাদেশের সর্বত্র। কিন্তু একজন স্বাধীনচেতা মানুষ হিসেবে আমি কখনোই এই আরোপিত হিজাব কে সমর্থ করতে পারি না।
বাংলাদেশের শতকরা ৮০ জনের মত মুসলিম। স্বাভাবিক ভাবে জন্মগতভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম হচ্ছে ইসলাম। নারী পুরুষের সংমিশ্রণে এই দেশ। আর নারী ও ইসলাম নিয়ে কথা উঠলেই কথা আসে পর্দাপ্রথার অর্থাৎ হিজাবের। ইসলামে নারী ও পুরুষ সবাইকে পোষাকের বিষয়ে নির্দেশ দেয়া আছে। কিন্তু কাজ ভেদে, খেলাধূলার ধরন ভেদে, আবহাওয়া ও তাপমাত্রা ভেদে, ভৌগলিক অবস্থান ও অঞ্চল ভেদে, কখনো বা সময়ের প্রভাবে পোষাক যুক্তিসঙ্গত কারণেই পাল্টায়। যাতে ঐ বিশেষ সময়ে, বিশেষ অবস্থায় মানুষ তার ক্রিয়াকর্মের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু ইসলামে নারীর পোষাক সংক্রান্ত বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ পোষাকের এই যৌক্তিক কার্যকারণগুলোকে মানে না। তাই এত বিতর্ক।
অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল মুসলিম নারীসমাজ এই অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের জন্য কোনো আন্দোলন বা প্রতিবাদ করতে পারেননি। মুসলিম নারীদের মুক্তির সংগ্রামে এই পর্দাপ্রথা হয়ে উঠেছে প্রধান অন্তরায়। দাসত্বের এই প্রতীকের জন্য তারা ক্ষমাগত নিম্নমুখি হচ্ছে। পুরুষ আধিপত্যের শেকল ছিঁড়ে নিজ গৃহের বন্দিত্ব থেকেই মুক্তি পাচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে নারীরা এর বিরোধীতা করে নি তা নয়। মুসলিম রমণীরা প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন এসব প্রথার বিরুদ্ধে। ১৯২৩ সালে মিশরে প্রথম একটি প্রতিবাদ হয়, মিশরের ফেমিনিস্ট ইউনিয়নের প্রধান মিজ হুদার নেতৃত্বে। তিনি ও তার সমর্থকরা প্রকাশ্যে তাদের পর্দা ছুঁড়ে ফেলে দেন সমুদ্রে। তুরস্কে হিজাবের বিরুদ্ধে সরকার থেকে লড়াই শুরু হয় ১৯২৭ সালে। তখন কম্যুনিস্ট সরকার ছিল ক্ষমতায়। সেই সময় ৭,০০০ মহিলা প্রকাশ্যে তাদের হিজাব ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামের সাথে শত্রুতা করার জন্য তাদের ৩০০ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। আজকের যে কট্টর আফগানিস্তান সেখানেও বাদশা শাহ এর সময় স্বাধীনতা উৎসবে, ১৯২৮ সালে পর্দাপ্রথার শেকল থেকে নারীকে মুক্তি দেয়ার জন্য তিনি তার স্ত্রীকে জনসম্মুখে পর্দা ছাড়া উপস্থিত হতে বলেছিলেন। পরে মুসলিম মৌলবাদীর ক্রমাগত প্রতিবাদের মুখে নারী মুক্তির সব ধরনের প্রকল্প তাকে বাদ দিতে হয়েছিল। ক্ষমতাও ছাড়তে হয় তাকে। ইরানের রেজা শাহ ১৯৩৬ সালে একটি বিশেষ আইন করে 'চাদর' পরা বন্ধের আদেশ দেন। কিন্তু সংস্কৃতির বিপক্ষে তার এই আদেশ জনপ্রিয়তা পায়নি এবং জনপ্রতিবাদের মুখে ১৯৪৬ সালে তিনি আবার তা পুনর্বহাল করেন।

পর্দা নারীর মুক্ত বিচরণকে রুদ্ধ করে দেয় এটি বলার অবকাশ রাখে না। যদিও মুসলিম রমণীদের অনেকে তাদের প্রয়োজনমত এসব নিয়মকানুনকে একটু মোচড়ে নিজের সুবিধামত ব্যবহার করেন। কিন্তু খুব একটা সরব প্রতিবাদে তারা সহজে জড়াতে চান না সাধারণত পরিবার সমাজ ধর্ম এবং রাষ্ঠ্র আরোপিত শাস্তির ভয়ে। কিন্তু ‘হিজাবের’ অর্থ কেবল পোষাকের মাঝে জড়িত মনে করলে ভুল করা হবে। এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে আরো অনেক নিয়ম-নীতি। যদি প্রশ্ন উঠে যে মুসলিম নারীর কি ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি আছে? এর উত্তরে অবশ্যই বলতে হবে তার নিজের বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে লুকিয়ে থাকাটাও হিজাবের বা পর্দা প্রথার অংশ।
এ বিষয়ে কোরানের সংশিস্নষ্ট আয়াত হচ্ছে ৩৩.৩৩: “And stay quietly in your houses, and make not a dazzling display, like that of the former Times of Ignorance; and establish regular Prayer, and give regular Charity; and obey Allah and His Messenger. And Allah only wishes to remove all abomination from you, ye members of the Family, and to make you pure and spotless.”
এই যে ঘরের মধ্যে নীরবে থাকার নির্দেশ; তা কোরানের। যারা ইসলামের সংশোধনে বিশ্বাসী এবং নিজেকে বিতর্কের বাহিরে রাখতে চান তারা এর সাথে আগের আয়াত যুক্ত করে একে চিহ্নিত করেন শুধুমাত্র নবীর স্ত্রীদের জন্য আদেশ বলে। যদিও নবীর কাজ এবং সম্মতি হাদিসের আওতায় পড়ে। যারা গোঁড়া/উগ্র মৌলবাদী কিংবা ইসলামী শাসন কায়েমে বিশ্বাসী তাদের মতে এই আদেশ সকল মুসলিম রমণীদের জন্য।
আজকের আধুনিক সমাজে যখন দেখি কোনো সম্প্রদায়ের যাবতীয় ধ্যান-ধারণা এবং চেতনা দিয়ে নারীকে পর্দা বা হিজাবের মধ্যে আবদ্ধ রাখার দলগত এবং ব্যক্তিগত চেষ্ঠায় লিপ্ত তখন অবাক এবং প্রতিবাদ না করে পারি না। এই একবিংশ শতাব্দিতে বিশ্ব যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন আমাদের বাংলাদেশে চলছে নারীকে হিজাবের আবরণে আবদ্ধ করার প্রচেষ্ঠা। পর্দাপ্রথা ও ইসলামের দোহাই দিয়ে নারীকে অবরোদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। সময় এসেছে পর্দা ছুড়ে ফেলে, নিজের সমাজের কুসংস্কার ও অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস এর মোহ থেকে মুক্ত করে যুক্তি এবং বাস্তবতার আলোকে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার। নারী দিবসে এই কামনা ব্যক্ত করছি।